
ইরানের ইসলামি বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক সময়সূচি ঘোষণা করেছে তেহরান। খামেনির স্মরণসভায় গঠিত বিশেষ কেন্দ্রীয় কমিটি জানিয়েছে, পবিত্র মহররম মাসের প্রথম দশ দিন পার হওয়ার পর এই ঐতিহাসিক জানাজা ও দাফন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। ইরানের আধাসরকারি সংবাদমাধ্যম মেহের নিউজ এজেন্সির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। মঙ্গলবার (০৯ জুন) খামেনি ও তার পরিবারের সদস্যদের জানাজা এবং স্মরণসভা নিয়ে গঠিত সদর দপ্তর থেকে দ্বিতীয়বারের মতো একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সাবেক সর্বোচ্চ নেতার বিদায় ও স্মরণ অনুষ্ঠানকে সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল উপায়ে আয়োজন করার জন্য দেশজুড়ে ব্যাপক ও দূরদর্শী প্রস্তুতি চালানো হচ্ছে।
স্মরণসভা কমিটির সদর দপ্তর থেকে প্রকাশিত বিবৃতিতে দেশি ও বিদেশি গণমাধ্যমে চলমান বিভিন্ন জল্পনা-কল্পনার তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমে খামেনির দাফনের সময় ও বিবরণ নিয়ে নানা ধরণের যাচাইবিহীন প্রতিবেদন ও গুজব ছড়ানো হচ্ছিল। কমিটি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে বলেছে, “এই ধরনের অসত্য ও ভিত্তিহীন তথ্য ঐতিহাসিক এই সমাবেশে যোগ দিতে ইচ্ছুক কোটি কোটি শোকাহত মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। গণমাধ্যমে প্রচারিত অনেক তথ্যেরই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি নেই।” তারা জনগণকে যেকোনো ধরণের গুজবে কান না দিয়ে শুধুমাত্র সরকারি এবং লজিস্টিক কমিটির পক্ষ থেকে দেওয়া বিবৃতির ওপর ভরসা রাখার আহ্বান জানিয়েছে।
বিবৃতিতে দাফন ও জানাজার সময় নির্ধারণের পেছনে একটি আবেগঘন এবং ঐতিহাসিক কারণ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কমিটি উল্লেখ করেছে, কারবালার মহান শহীদ ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শোকানুষ্ঠান ও ইসলামের ঐতিহ্য পালনের প্রতি শহীদ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির আজীবনের গভীর অঙ্গীকার ছিল। সেই দীর্ঘদিনের ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। হিজরি সনের অত্যন্ত পবিত্র মাস মহররমের প্রথম দশ দিন (আশুরা পর্যন্ত) শিয়া প্রধান ইরানে ঐতিহাসিকভাবেই শোকের মাস হিসেবে পালিত হয়। এই দিনগুলোতে পুরো দেশজুড়ে সাধারণ মানুষ ইমাম হুসাইনের স্মরণে শোক মিছিলে অংশ নেন। ফলস্বরূপ, আশুরার পর মহররম মাসের প্রথম দশ দিন শেষ হওয়ার পরেই সর্বোচ্চ নেতার জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠান আয়োজনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শহীদ নেতার আদর্শ এবং ইমাম হুসাইনের প্রতি তাঁর আজীবন ভালোবাসার প্রতি সম্মান জানিয়েই মহররমের প্রথম দশ দিনের শোক উৎসবের পরে এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হবে। স্মরণসভা কমিটি
ইরানের সরকারি ও আধাসরকারি প্রশাসন খামেনির এই জানাজাকে ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম জনসমাবেশ হিসেবে দেখছে। কমিটি জানিয়েছে, শোকাহত সাধারণ মানুষ, বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান এবং কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের যথাযথ নিরাপত্তা ও ল পরিষেবা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং দেশের বিভিন্ন জনপ্রিয় সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠনগুলো রাতদিন কাজ করে যাচ্ছে। চূড়ান্ত সময়সূচি এবং লজিস্টিক ব্যবস্থাপনার সমন্বয় এখন শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তবে অনুষ্ঠানে লাখ লাখ মানুষের সমাগম সামাল দিতে পরিবহন, আবাসন ও জরুরি চিকিৎসা সেবার বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। অনুষ্ঠান সংক্রান্ত আরও বিস্তারিত রূপরেখা এবং সুনির্দিষ্ট তারিখ সদর দপ্তর থেকে পরবর্তীতে ক্রমান্বয়ে সাধারণ ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের জন্য ঘোষণা করা হবে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে একটি আকস্মিক ও বড় ধরনের সামরিক হামলা চালায়। অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও বিধ্বংসী এই হামলায় ইরানের ইসলামী বিপ্লবের অবিসংবাদিত নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি, তার পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য এবং দেশের উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা শাহাদাত বরণ করেন। এই হামলার পর থেকে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। ইরানের আপামর জনসাধারণ তাদের অভিভাবক ও সর্বোচ্চ নেতাকে হারিয়ে গভীর শোকে মগ্ন। এই পরিস্থিতিতে খামেনির শেষ বিদায় অনুষ্ঠানকে একটি ঐতিহাসিক ও সংহতির প্রতীক হিসেবে রূপ দিতে বদ্ধপরিকর দেশটির বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন। মেহের নিউজ জানিয়েছে, দাফন অনুষ্ঠানকে ঘিরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ইসলামি চিন্তাবিদ এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে, যার কারণে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে।