
ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের যেকোনো ধরনের অপতৎপরতা ও পুনর্বাসনের অপচেষ্টাকে রুখে দিতে রাজপথে নেমেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) শাখা ছাত্রদল। ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চক্রান্তের প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এক বিশাল বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে সংগঠনটি। মঙ্গলবার (৯ জুন) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের রফিক ভবনের সামনে থেকে ছাত্রদলের এই বিক্ষোভ মিছিলটি শুরু হয়। মিছিলটি সম্পূর্ণ ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে এক উত্তপ্ত ও সজাগ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
মঙ্গলবার দুপুর গড়াতেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের শত শত নেতাকর্মী রফিক ভবনের সামনে জড়ো হতে থাকেন। সেখান থেকে “ক্যাম্পাসে কোনো সন্ত্রাসীর ঠাঁই হবে না”, “নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের অপতৎপরতা রুখে দাও” ইত্যাদি স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো ক্যাম্পাস। মিছিলটি রফিক ভবনের সামনে থেকে শুরু হয়ে প্রশাসনিক ভবন (ভিসি ভবন), বিজ্ঞান অনুষদ এবং সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ভবন প্রদক্ষিণ করে। ক্যাম্পাসের প্রধান প্রধান সড়কগুলো ঘুরে মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রধান মিলনস্থল ‘শান্ত চত্বরে’ গিয়ে এসে শেষ হয়। সেখানে এক সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে ছাত্রদলের শীর্ষ স্থানীয় নেতারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং ক্যাম্পাসের শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখার ব্যাপারে তাদের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
এই বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের সূত্রপাত হয় মূলত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ছবিকে কেন্দ্র করে। এর আগে সকালের দিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ৩নং ফটকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ব্যানার হাতে কয়েকজন যুবকের মানববন্ধনের একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হু হু করে ছড়িয়ে পড়ে। নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, মঙ্গলবার সকাল ৯ টায় তারা এই কর্মসূচি পালন করেছে। তবে ছবিটির সত্যতা নিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই তীব্র বিতর্ক ও সন্দেহ দানা বাঁধে। প্রযুক্তির সহায়তায় এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ছবিতে দৃশ্যমান ব্যক্তিদের হাত, পা ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গে মারাত্মক অসংলগ্নতা রয়েছে। আইটি বিশেষজ্ঞদের মতে, ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) কিংবা ফটোশপের মাধ্যমে এডিট করে তৈরি করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ ভুয়া বা ‘ফেক’।
তাছাড়া, ওই সময়ে ক্যাম্পাসে উপস্থিত সাধারণ শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তাকর্মী এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের কেউই এ ধরনের কোনো মানববন্ধন বা সমাবেশ সশরীরে দেখেননি বলে নিশ্চিত করেছেন। মূলত ক্যাম্পাস ও দেশজুড়ে একটি কৃত্রিম আতঙ্ক এবং অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই নিষিদ্ধ সংগঠনটি এই ডিজিটাল প্রোপাগান্ডার আশ্রয় নিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। শান্ত চত্বরে অনুষ্ঠিত সমাবেশে জবি শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব শামছুল আরেফিন তার বক্তব্যে বলেন: ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে ছাত্রসমাজ আর কোনো স্বৈরাচারের দোসরদের মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে দেবে না। নিষিদ্ধ সংগঠনের পুনর্বাসনের যেকোনো অপচেষ্টার বিরুদ্ধে দেশের সাধারণ ছাত্রসমাজকে সর্বদা ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় একটি সুষ্ঠু, সুন্দর ও নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ সম্পন্ন ক্যাম্পাস। এখানে ফ্যাসিবাদের সহযোগী কোনো সন্ত্রাসী ও অপসংস্কৃতির রাজনীতি ফিরে আসার কোনো সুযোগ নেই এবং ছাত্রদল তা কঠোর হস্তে দমন করবে।
সমাবেশের সমাপনী বক্তব্যে সংগঠনের আহ্বায়ক মেহেদি হাসান হিমেল তীব্র হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন:
নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের ব্যানারে ক্যাম্পাসে ভুয়া এডিটেড ছবি দিয়ে কিংবা গোপনে কর্মসূচি পালনের যে অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে, তা বিশ্ববিদ্যালয়ের সচেতন ও সাধারণ শিক্ষার্থীবৃন্দ কখনো মেনে নেবে না। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে কোনোভাবেই অশান্ত করতে দেওয়া হবে না। ক্যাম্পাসে কোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করা হলে, সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে ছাত্রদল রাজপথেই তার দাঁতভাঙা জবাব দেবে এবং যেকোনো ষড়যন্ত্র প্রতিহত করবে।
মঙ্গলবারের এই বিশাল বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশে জবি ছাত্রদলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। সমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জবি ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক জাফর আহমেদ, যুগ্ম আহ্বায়ক সুমন সরদার, মো. মুস্তাফিজুর রহমান রুমি, শাহরিয়ার আহমেদ, কে. এম. মাহমুদ হাসান, রবিউল আউয়াল, ইয়াকুব শেখ অনিক এবং শাখায়তুল ইসলাম খান পরাগসহ বিভিন্ন অনুষদ ও বিভাগের অসংখ্য নেতাকর্মী। সমাবেশ শেষে নেতারা ক্যাম্পাসজুড়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সতর্ক অবস্থানে থাকার ঘোষণা দেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেও এ বিষয়ে কঠোর নজরদারি রাখার আহ্বান জানানো হয়, যাতে কোনো নিষিদ্ধ সংগঠনের কেউ ক্যাম্পাসের সাধারণ শিক্ষার্থীদের শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত করতে না পারে।