
বড়াইগ্রামে শিশু নির্যাতনচেষ্টা মামলা ঘিরে ধোঁয়াশা, গ্রেফতারের পরও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
মোঃ আলমগীর কবির, বড়াইগ্রাম উপজেলা প্রতিনিধি (নাটোর)
নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার শ্রীরামপুর গ্রামে তিন বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে দায়ের করা মামলার পলাতক আসামি মো. আয়নাল খন্দকারকে (৫০) গ্রেফতার করেছে র্যাব। তবে ঘটনাটিকে ঘিরে এলাকাজুড়ে নানা আলোচনা, প্রশ্ন ও ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে বেশ কিছু ভিন্নমুখী তথ্য, যা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে চলছে ব্যাপক আলোচনা।
র্যাব সূত্রে জানা যায়, গত রোববার রাতে পাবনার চাটমোহর উপজেলার গাইনগর বটতলা এলাকায় র্যাব-৫, সিপিসি-২ নাটোর ক্যাম্প এবং র্যাব-১২, সিপিসি-২ পাবনা ক্যাম্পের যৌথ অভিযানে আয়নাল খন্দকারকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি বড়াইগ্রাম উপজেলার শ্রীরামপুর গ্রামের মৃত রফিন খন্দকারের ছেলে। পরে তাকে বড়াইগ্রাম থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
মামলা সূত্রে জানা গেছে, গত ১৮ জুন সকালে শ্রীরামপুর গ্রামের ওই শিশুটি দোকানে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়। অভিযোগ রয়েছে, পথে আয়নাল খন্দকার শিশুটিকে ফুসলিয়ে নিজ বাড়িতে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করেন। শিশুটির চিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে তিনি পালিয়ে যান। এ ঘটনায় পরদিন শিশুটির মা বাদী হয়ে বড়াইগ্রাম থানায় মামলা দায়ের করেন।
তবে ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর কয়েকজন সাংবাদিক ঘটনাস্থলে গিয়ে অনুসন্ধান চালালে ভিন্নধর্মী কিছু তথ্য সামনে আসে। স্থানীয় অনেকের দাবি, এজাহারে উল্লেখিত গুরুতর শারীরিক আঘাত ও হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার বিষয়টি নিয়ে শুরু থেকেই এলাকায় সন্দেহ ও আলোচনা ছিল।
অনুসন্ধানে একজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীর সন্ধান পাওয়া গেছে। তিনি দাবি করেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি শিশুটিকে হাত দিয়ে উপরে তুলে নিয়েছিলেন। তবে অভিযোগে বর্ণিত গুরুতর শারীরিক নির্যাতনের ঘটনাটি তিনি প্রত্যক্ষ করেননি বলে জানান।
অভিযুক্ত পক্ষের দাবি, অভিযুক্ত ব্যক্তি ও শিশুটির পরিবারের মধ্যে দীর্ঘদিনের আত্মীয়তাসুলভ সম্পর্ক রয়েছে। তাদের ভাষ্যমতে, দাদা-নাতনির মতো স্নেহের সম্পর্কের কারণেই শিশুটিকে কোলে তুলে নেওয়া হয়েছিল। পারিবারিক ও পূর্বের বিরোধের জের ধরে ঘটনাটিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে মামলা দায়ের করা হয়েছে বলেও তারা অভিযোগ করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অভিযোগ ওঠার পর এলাকার কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির উদ্যোগে একটি সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে মারধর করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি বিচারের নামে আর্থিক জরিমানা আরোপ নিয়ে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে সমঝোতা না হওয়ায় মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে এলাকায় আলোচনা রয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, এজাহারে একাধিক সাক্ষীর নাম উল্লেখ করা হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য পাওয়া গেছে। ফলে অন্যান্য সাক্ষীদের উপস্থিতি ও ঘটনার সময় তাদের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অন্যদিকে, অভিযোগ অনুযায়ী সকাল ৮টার দিকে প্রকাশ্য দিবালোকে ঘটনাটি ঘটলেও শিশুটিকে রাত ১১টার দিকে হাসপাতালে ভর্তি দেখানো হয়েছে। গুরুতর আহত হওয়ার দাবি করা হলেও তাৎক্ষণিক চিকিৎসা না নিয়ে দীর্ঘ সময় পর হাসপাতালে নেওয়ার বিষয়টিও স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
এ বিষয়ে বড়াইগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুস ছালাম বলেন, “র্যাব অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে। তাকে আদালতে সোপর্দের প্রক্রিয়া চলছে। মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।”
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিমত, কোনো ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে অপরাধ করে থাকলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। একই সঙ্গে মিথ্যা অভিযোগের মাধ্যমে কাউকে হয়রানি করা হলেও সেটি সমানভাবে গুরুতর অপরাধ। তাই পুরো ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন তারা।