
করনীতি ও উচ্চ সুদের চাপে রাজশাহীর আবাসন খাত সংকটে, নীতিগত সংস্কারের দাবি
অপু দাস,ব্যুরো প্রধান,রাজশাহী।
করনীতি, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হার এবং নির্মাণসামগ্রীর ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধির কারণে রাজশাহীর আবাসন খাত গভীর সংকটের মধ্যে রয়েছে বলে দাবি করেছে আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং ডেভেলপার্স অ্যাসোসিয়েশন (রিডা-REDA)। সংগঠনটির নেতারা বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে নতুন আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন আরও কঠিন হয়ে পড়বে, ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শিল্পেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
শনিবার (২৭ জুন) দুপুরে রাজশাহী নগরীর একটি রেস্টুরেন্টে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে রিডার পক্ষ থেকে এসব দাবি তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আ. স. ম. মিজানুর রহমান কাজী।
লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, রাজশাহীর আবাসন বাজার মূলত চাকরিজীবী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট পরিবার এবং মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত মানুষের সঞ্চয়নির্ভর। ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো বৃহৎ কর্পোরেট বিনিয়োগ এখানে তুলনামূলক কম। ফলে কর বৃদ্ধি ও ঋণের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রভাব এ অঞ্চলের আবাসন খাতে দ্রুত পড়েছে।
তিনি জানান, ২০২৩ সালে কার্যকর হওয়া করনীতিতে যৌথ উন্নয়ন (জয়েন্ট ডেভেলপমেন্ট) পদ্ধতিতে জমি উন্নয়নের ক্ষেত্রে জমির মালিকদের ওপর ১৫ শতাংশ ক্যাপিটাল গেইনস ট্যাক্স আরোপের পর অনেক জমির মালিক ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিতে আগ্রহ হারিয়েছেন। এতে নতুন প্রকল্প গ্রহণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। পাশাপাশি সাইনিং মানি, উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি এবং পরবর্তী বিক্রয়ের বিভিন্ন ধাপে কর পরিশোধের বাধ্যবাধকতা প্রকল্প বাস্তবায়নকে আরও ব্যয়বহুল করে তুলেছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, রড, সিমেন্টসহ নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির কারণে প্রতি বর্গফুট ফ্ল্যাট নির্মাণে অতিরিক্ত প্রায় দুই হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে। অন্যদিকে ব্যাংক ঋণের সুদের হার প্রায় ১৬ শতাংশ এবং ফ্ল্যাট নিবন্ধনের ব্যয় প্রায় ১৩ শতাংশ হওয়ায় আবাসন কেনা সাধারণ মানুষের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
রিডার নেতাদের ভাষ্য, সাম্প্রতিক শুল্ক সমন্বয় এবং বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে প্রতি টন রড উৎপাদনে অতিরিক্ত ১১ থেকে ১২ হাজার টাকা ব্যয় যোগ হয়েছে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও বাজারে ক্রেতার সংখ্যা কমে যাওয়ায় অনেক নির্মিত ফ্ল্যাট বিক্রি হচ্ছে না। এর ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান সময়মতো ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছে।
তারা বলেন, আবাসন শিল্পের সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে ২৬৯টি সহযোগী শিল্প জড়িত। নির্মাণসামগ্রী, পরিবহন, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, স্যানিটারি পণ্য, আসবাবপত্র, রং, সিরামিক, অ্যালুমিনিয়াম, কাচসহ বিভিন্ন খাত এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। ফলে আবাসন খাতে দীর্ঘস্থায়ী মন্দা দেখা দিলে এসব শিল্পেও এর প্রভাব পড়বে।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা আরও বলেন, আবাসন খাত দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। তাই এ খাতের স্থবিরতা দীর্ঘায়িত হলে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
রিডার পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়, নিবন্ধন ব্যয় ও করের হার বেশি হওয়ায় অনেক ক্রেতা সম্পত্তি নিবন্ধনে অনাগ্রহী হয়ে পড়ছেন। এর ফলে সরকারও সম্ভাব্য রাজস্ব আদায় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংগঠনটি সরকারের কাছে কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরে। এর মধ্যে রয়েছে—জমি হস্তান্তর, সাইনিং মানি এবং ফ্ল্যাট নিবন্ধনের ওপর আরোপিত কর ও ভ্যাটের হার যৌক্তিক পর্যায়ে পুনর্বিবেচনা করা এবং মধ্যবিত্ত মানুষের আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করতে এক অঙ্কের (সিঙ্গেল ডিজিট) সুদে দীর্ঘমেয়াদি বিশেষ গৃহঋণের ব্যবস্থা চালু করা।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, সময়োপযোগী নীতিগত সংস্কার গ্রহণ করা হলে আবাসন খাত আবারও গতি ফিরে পাবে, বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে এবং অর্থনীতির বিভিন্ন খাত ইতিবাচকভাবে উপকৃত হবে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন রিডার সভাপতি তৌফিকুর রহমান লাভলু, সিনিয়র সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট ইরশাদ আলী ইশা, সহ-সভাপতি মোহাম্মদ কবির হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মেজবাউল বারীসহ সংগঠনের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।