
নীরব ভাঙনের এক গল্পঃ–সাইলেন্ট ডিভোর্সের অদৃশ্য বাস্তবতা
মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম ঢাকা জেলা প্রতিনিধি দৈনিক প্রভাতী বাংলাদেশ
বিশেষ প্রতিবেদনঃ–সাইলেন্ট ডিভোর্স নীরব বিচ্ছেদ–সমসাময়িক সমাজে ক্রমেই আলোচিত একটি বাস্তবতা। এটি এমন এক অবস্থা যেখানে স্বামী–স্ত্রী আইনগত ভাবে একসঙ্গে থাকলেও তাদের সম্পর্কের ভেতরের প্রাণশক্তি ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যায়। বাইরে থেকে একটি স্বাভাবিক সংসার মনে হলেও ভেতরে জমে থাকে দুরত্ব, নিরবতা ও অদৃশ্য বিচ্ছিন্নতা।
বিবাহ কেবল একটি সামাজিক বা ধর্মীয় চুক্তি নয়,এটি ভালোবাসা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সম্মান, বিশ্বাস এবং দায়িত্ববোধের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি মানবিক সম্পর্ক। কিন্তু বাস্তব জীবনে নানা কারনে এই ভিত্তিগুলো দুর্বল হয়ে পড়লে সম্পর্কটি ধীরে ধীরে ফাঁপা হয়ে যায়।তখন এক ছাদের নিচে বসবাস করেও স্বামী–স্ত্রী যেন দুই ভিন্ন জগতের মানুষ হয়ে ওঠেন। প্রয়োজন ছাড়া কথা হয় না, আবেগের আদান–প্রদান কমে যায়, আর একসময় প্রিয় মানুষটিই হয়ে ওঠে কেবল একজন সহবাসী।
সাইলেন্ট ডিভোর্স হঠাৎ করে তৈরি হয় না। এটি মূলত দীর্ঘ দিনের জমে থাকা অসন্তোষ অবহেলা ও অপ্রকাশিত কষ্টের ফল। ছোট ছোট ভূল বোঝাবুঝি যোগাযোগের অভাব,পারস্পরিক অসম্মান, একে অপরকে সময় না দেওয়া কিংবা বিশ্বাস ঘাতকতার মতো বিষয় গুলো ধীরে ধীরে সম্পর্কের ভেতরে অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে।
এই দেয়াল এক সময় এতটাই শক্ত হয়ে যায় যে,তাহা ভাঙার সাহস বা আগ্রহ—দুটোই হাড়িয়ে যায়।
অনেক দস্পতি এই অবস্হায় থেকে ও আইনি বিচ্ছেদের পথে এগিয়ে যান না, এর পেছনে বিভিন্ন কারণ কাজ করে—–সন্তানদের ভবিষ্যৎ, পারিবারিক সম্মান,সামাজিক চাপ,আর্থিক নির্ভরতা বা অনিশ্চয়তা ভয়।
ফলে তারা সম্পর্কের ভেতরের শূন্যতা মেনে নিয়েই একই ছাদের নীচে জীবন চালিয়ে যান। বাইরে থেকে সংসার টিকে থাকলেও ভেতরে ভেতরে তা হয়ে ওঠে নিঃসাড়,প্রাণহীন।
এই নীরব বিচ্ছেদের প্রভাব শুধু দস্পতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি সন্তানদের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে। একটি পরিবারের যদি ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও উষ্ণতার অভাব থাকে,তাহলে সেই পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুরা মানসিক ভাবে অনিরাপদ বোধ করতে পারে।তারা সম্পর্কের প্রতি আস্হা হাড়াতে পারে,কিংবা ভবিষ্যতে সুস্হ সম্পর্ক গড়তে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে উঠতে পারে। সাইলেন্ট ডিভোর্সের সবচেয়ে জটিল দিক হলো-+এটি দৃশ্যমান কোন সংকট নয়।এখানে কোন উচ্চস্বরে ঝগড়া নেই, আদালতের মামলা নেই, কিংবা আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদের ঘোষণা নেই। তবুও সম্পর্কের ভেতরের বন্ধন অনেক আগেই ভেঙে যায়। এই নিরবতা তাই অনেক সময় প্রকাশ্য দ্বন্দ্বের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
তবে এই পরিস্থিতি এড়ানো অসম্ভব নয়।একটি সুস্থ দাস্পত্য সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো খোলামেলা যোগাযোগ। নিজের অনুভূতির প্রকাশ করা,অপরজনের কথা মন দিয়ে শোনা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সম্মান বজায় রাখা—এই তিনটি বিষয় সম্পর্ককে জীবন্ত রাখে। ছোট খাটো সমস্যাকে অবহেলা না করে সময়মতো সমাধান করার চেষ্টা করা জরুরি। পাশাপাশি একে অপরকে সময় দেওয়া,কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এবং সম্পর্কের মূল্য বোঝা –এ সবই নীরব দূরত্বকে কমাতে সহায়ক। সবশেষে বলা যায়, সাইলেন্ট ডিভোর্স কোন হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘঠনা নয়,এটি ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া এক নীরব ভাঙন। এই ভাঙন এড়াতে প্রয়োজন সচেতনতা,আন্তরিকতা এবং সম্পর্কটিকে বাঁচিয়ে রাখার ইচ্ছা। কারন একটি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য শুধু এক সঙ্গে থাকা যথেষ্ট নয়—একসঙ্গে অনুভব করাটাও সমান জরুরি।