
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট গভীর লঘুচাপ এবং সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে কক্সবাজার জেলা জুড়ে চলছে অবিরাম ও রেকর্ড ভাঙা ভারী বর্ষণ। গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিপাতে জেলার অন্যান্য উপজেলার মতো সীমান্তবর্তী ও পাহাড়ি অঞ্চল টেকনাফেও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে প্রাকৃতিক পরিস্থিতি। অবিরাম বৃষ্টির ফলে টেকনাফের বিভিন্ন পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে গেছে, যার কারণে যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের পাহাড়ধসের আশঙ্কা করছেন আবহাওয়াবিদ ও স্থানীয় প্রশাসন। এই চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও সংকটময় পরিস্থিতিতে টেকনাফের পাহাড়ের পাদদেশে এবং ঝুঁকিপূর্ণ ঢালু এলাকায় বসবাসকারী সর্বস্তরের মানুষকে কোনো প্রকার অবহেলা না করে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার জন্য জরুরি আহ্বান জানিয়েছেন কক্সবাজার জেলা বিএনপির অর্থ সম্পাদক ও বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আলহাজ্ব মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ। আজ এক জরুরি বিবৃতিতে তিনি টেকনাফবাসীর প্রতি এই মানবিক ও সতর্কতামূলক আহ্বান জানান।
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া ও পাহাড়ধসের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে মজলুম জননেতা আলহাজ্ব মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেন, “প্রাকৃতিক দুর্যোগের ওপর মানুষের কোনো হাত নেই, তবে আগাম সতর্কতা এবং সঠিক পদক্ষেপের মাধ্যমে আমরা মূল্যবান জীবন রক্ষা করতে পারি। এই মুহূর্তে টেকনাফের পাহাড়ের পাদদেশে যারা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাস করছেন, তাদের প্রতি আমার বিনীত অনুরোধ—আপনারা জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলবেন না। মানুষের জীবনই সবচেয়ে মূল্যবান। ঘরবাড়ি বা সম্পদ পরে রক্ষা করা যাবে বা আবারও গড়ে তোলা যাবে, কিন্তু একটি প্রাণ চলে গেলে তা আর কোনোদিন ফিরে পাওয়া যাবে না। তিনি আরও যোগ করেন, “প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই ক্রান্তিকালে কোনো ধরনের অবহেলা বা ঝুঁকি নেওয়া সমীচীন হবে না। সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে এবং স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবকদের দেওয়া সকল নির্দেশনা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলতে হবে। কোনো প্রকার দ্বিধাদ্বন্দ্ব না রেখে দ্রুত নিকটস্থ আশ্রয়কেন্দ্র বা নিরাপদ পাকা ভবনে আশ্রয় গ্রহণ করুন।
স্থানীয় সুশীল সমাজ ও পরিবেশবাদীদের মতে, টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা, হোয়াইক্যং, শাপলাপুর, বাহারছড়া এবং সদর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকায় হাজার হাজার মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন। গত কয়েক বছরে অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটা এবং বনায়ন ধ্বংস করার কারণে টেকনাফের পাহাড়গুলো মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। সামান্য ভারী বৃষ্টিতেই এসব পাহাড়ের মাটি ধসে নিচে পড়ে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে পাশ্ববর্তী উখিয়া ও কক্সবাজার সদরে পাহাড়ধসে প্রাণহানির ঘটনার পর টেকনাফ জুড়েই চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর ইতিমধ্যে কক্সবাজার অঞ্চলে ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের সতর্কতা জারি করেছে। পাহাড়ি এলাকায় বসবাসরত পরিবারগুলো যদি দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে না যায়, তবে টেকনাফেও যেকোনো সময় বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় ঘটে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিবৃতিতে আলহাজ্ব মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ কেবল সাধারণ মানুষকে সতর্ক করেই ক্ষান্ত হননি, বরং এই জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলায় সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন, রাজনৈতিক কর্মী, রেড ক্রিসেন্টসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্যদের প্রতি জোরালো অনুরোধ জানিয়ে বলেন, “দুর্যোগের এই সময়ে আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিচয় ভুলে যেতে হবে। মানবতাই হোক আমাদের মূল চালিকাশক্তি। টেকনাফের সকল স্তরের নেতাকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের প্রতি আমার নির্দেশ, আপনারা অবিলম্বে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় যান এবং সাধারণ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে প্রশাসনকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করুন। তিনি আরও বলেন, “‘সতর্ক থাকুন, নিরাপদ থাকুন, জীবন বাঁচান’—এই মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে আমাদের এই দুর্যোগের দিনগুলো পার করতে হবে। টেকনাফ ও উখিয়ার পাহাড়ি জনপদের মানুষ সবসময়ই প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়। কিন্তু এবার বৃষ্টির যে ধরণ, তাতে আমাদের আরও বেশি সচেতন হতে হবে। একে অপরের পাশে দাঁড়িয়ে মানবিক দায়িত্ব পালন করাই এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় ইবাদত।
দুর্যোগকালীন সময়ে টেকনাফবাসীর সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এই সতর্কবার্তায়। স্থানীয়দের প্রতি বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে, এই বৈরি আবহাওয়ার মধ্যে অপ্রয়োজনে পাহাড়ি এলাকা বা পাহাড়ের ঢালু অঞ্চলগুলোতে যাতায়াত থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে। এছাড়া পাহাড়ের পাদদেশে থাকা রাস্তাঘাটগুলোতে চলাচলের সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।ভারী বৃষ্টির কারণে পাহাড়ি ছড়া ও নিচু এলাকাগুলো ইতিমধ্যে প্লাবিত হতে শুরু করেছে। তাই খুব বেশি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের না হতে এবং শিশু ও বৃদ্ধদের ঘরের নিরাপদ স্থানে রাখতে বলা হয়েছে। একই সাথে, আবহাওয়ার সর্বশেষ তথ্য ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং বা যে কোনো জরুরি ঘোষণা নিয়মিত অনুসরণ করার জন্যও সবাইকে বিশেষভাবে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে টেকনাফ উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় মাইকিং করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম এলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাময়িক মাইকিং করা হলেও পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি উচ্ছেদে কোনো স্থায়ী সমাধান নেওয়া হয় না। টেকনাফ প্রতিনিধি মোহাম্মদ রায়হান ইসলামের প্রতিবেদনে জানা যায়, বর্তমানে বৃষ্টির যে বেগ, তাতে পাহাড়ের মাটি সম্পূর্ণ নরম হয়ে ধসে পড়ার উপক্রম হয়েছে। সাধারণ মানুষ যদি সচেতন হয়ে স্বেচ্ছায় নিরাপদ আশ্রয়ে সরে না যায়, তবে জানমালের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বের এই সময়োচিত আহ্বান যদি টেকনাফবাসী সঠিকভাবে লুফে নেয়, তবে সম্ভাব্য বড় ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।