
চার বছর আগের অঙ্গীকার ও আরডিএর নির্দেশ অমান্য করে ছাদ সম্প্রসারণের অভিযোগ
ব্যুরো প্রধান, রাজশাহী।
রাজশাহী মহানগরীর শিরইল এলাকায় চার বছর আগে দেওয়া লিখিত অঙ্গীকারনামা এবং রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) নির্দেশনা অমান্য করে একটি বহুতল ভবনের ছাদ ও কার্নিশসংলগ্ন অংশ সম্প্রসারণের অভিযোগ উঠেছে। অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
অভিযোগটি রাজশাহী মহানগরীর বোয়ালিয়া থানাধীন শিরইল এলাকার আরএস-৩৪৭২ নম্বর দাগের একটি তিনতলা ভবনকে কেন্দ্র করে। প্রতিবেশীদের অভিযোগ, মোজ্জামেল হকের মেয়ে মোসাঃ হোসনে আরা বেগমের মালিকানাধীন ভবনে অনুমোদিত নকশার বাইরে গিয়ে ছাদ ও কার্নিশের অংশ বাড়ানোর কাজ করা হচ্ছে। বিশেষ করে পাশের বাড়ির সীমানার কাছাকাছি অতিরিক্ত নির্মাণকাজ করায় প্রতিবেশী স্থাপনা ও বসবাসকারীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য থেকে জানা যায়, গত ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অথরাইজড অফিসার মো. আব্দুল্লাহ আল তারিক স্বাক্ষরিত একটি কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হয়। ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২-এর ৩(খ) ধারা অনুযায়ী জারি করা ওই নোটিশে বলা হয়, শিরইল মৌজার ৩৪৭২ নম্বর দাগে নির্মাণাধীন তিনতলা ইমারতে অনুমোদিত নকশা যথাযথভাবে প্রদর্শন করা হয়নি এবং নির্মাণকাজে অনুমোদিত নকশার উল্লেখযোগ্য ব্যত্যয় ঘটেছে।
আরডিএর ওই নোটিশে সংশ্লিষ্ট নির্মাণকাজের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে সাত দিনের সময় দেওয়া হয়। পাশাপাশি আইন অনুযায়ী অবৈধ বা অনুমোদনবহির্ভূত নির্মাণ অপসারণ কিংবা ভেঙে ফেলার বিষয়ে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, সে বিষয়ে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
নোটিশে আরও উল্লেখ করা হয়, নোটিশ পাওয়ার পর থেকে আরডিএর পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ভবনে সব ধরনের নির্মাণকাজ বন্ধ রাখতে হবে। বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বোয়ালিয়া মডেল থানার অফিসার ইন-চার্জের কাছেও নোটিশের অনুলিপি পাঠানো হয়।
এদিকে, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে জানা যায়, প্রায় চার বছর আগে ২০২২ সালে একই ভবনকে ঘিরে একটি লিখিত অঙ্গীকারনামা দেওয়া হয়েছিল। রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের ২১ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত ওই ভবনের মালিক মোজ্জামেল হকের মেয়ে মোসাঃ হোসনে তারা (আরা) বেগম ওই অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করেন।
অঙ্গীকারনামায় বলা হয়, নিজস্ব জায়গায় বহুতল ভবন নির্মাণের সময় প্রতিবেশী প্রফেসর ড. মকবুল হোসেনের বাড়ির পাশের অংশে ভবনের ছাদ, সানসেড ও কার্নিশ নির্মাণের ক্ষেত্রে এক ফুট জায়গা খালি রাখা হবে। একই সঙ্গে অঙ্গীকারনামায় উল্লেখ করা হয়, পরবর্তীতে ওই শর্তের কোনো ধরনের ব্যত্যয় ঘটলে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ইমারত নির্মাণ-সংক্রান্ত আইন ও বিধি অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ যে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে, তা মেনে নেওয়া হবে।
তবে বর্তমানে ওই অঙ্গীকারনামার শর্ত মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন প্রতিবেশীরা। তাদের দাবি, চার বছর আগে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখার কথা থাকলেও সম্প্রতি ভবনের কার্নিশসংলগ্ন এলাকায় অতিরিক্ত নির্মাণকাজ শুরু করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, নতুন করে পিলার স্থাপন এবং ছাদ ও প্রাচীরের অংশ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, ভবনের একেবারে পাশ ঘেঁষে এ ধরনের নির্মাণকাজ চলতে থাকলে দুই স্থাপনার মধ্যকার নিরাপদ দূরত্ব কমে যেতে পারে। এতে পাশের বাড়ির স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বসবাসকারীদের জন্যও ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রতিবেশী প্রফেসর ড. মকবুল হোসেনের অভিযোগ, আরডিএ থেকে নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হলেও তা পুরোপুরি অনুসরণ করা হচ্ছে না। তার দাবি, সরকারি সংস্থার নির্দেশনা থাকা অবস্থায়ও তার বাড়ির পাশ ঘেঁষে অতিরিক্ত জায়গায় প্রাচীর ও ছাদ নির্মাণের চেষ্টা করা হচ্ছে।
ঘটনার সর্বশেষ পর্যায়ে আজ আবারও ছাদসংলগ্ন অতিরিক্ত অংশে প্রাচীর নির্মাণের কাজ শুরু হলে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রফেসর ড. মকবুল হোসেন। পরে তিনি বোয়ালিয়া মডেল থানার অফিসার ইন-চার্জ (ওসি) মাছুমা মুস্তারীকে ফোন করে বিষয়টি জানান।
অভিযোগ পাওয়ার পর বোয়ালিয়া মডেল থানা থেকে পুলিশ সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে যান। তারা সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন এবং নির্মাণকাজকে কেন্দ্র করে যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করেন।
পুলিশের পক্ষ থেকে আপাতত নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের জারি করা নির্দেশনা ও সংশ্লিষ্ট আইন মেনে চলার জন্য সংশ্লিষ্টদের অবহিত করা হয়।
প্রফেসর ড. মকবুল হোসেন বলেন, প্রায় চার বছর আগে মোজ্জামেল হকের মেয়ে হোসনে আরা বেগম নিজ স্বাক্ষরে একটি লিখিত অঙ্গীকারনামা দিয়েছিলেন। সেখানে তাদের বাড়ির পাশের অংশে ভবনের ছাদ, সানসেড ও কার্নিশ নির্মাণের ক্ষেত্রে এক ফুট জায়গা ছেড়ে দেওয়ার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল।
তিনি বলেন, বর্তমানে সেই অঙ্গীকারনামার শর্ত অনুসরণ করা হচ্ছে না বলে তিনি মনে করছেন। তার অভিযোগ, আরডিএর পক্ষ থেকে নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়ার পরও বাড়ির পাশ ঘেঁষে অতিরিক্ত জায়গা নিয়ে প্রাচীর ও ছাদ নির্মাণের চেষ্টা করা হচ্ছে।
প্রফেসর ড. মকবুল হোসেন আরও বলেন, এভাবে নির্মাণকাজ চলতে থাকলে তার বাড়ির স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিষয়টি যথাযথভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
এ বিষয়ে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অথরাইজড অফিসার মো. আব্দুল্লাহ আল তারিক বলেন, সংশ্লিষ্ট ভবনের নির্মাণকাজে অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় এবং অনুমোদনবহির্ভূত নির্মাণের অভিযোগ পাওয়ার পর ইমারত নির্মাণ আইন অনুযায়ী কারণ দর্শানোর নোটিশ ও নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, আরডিএর নির্দেশনা উপেক্ষা করে পুনরায় নির্মাণকাজ চালানো হলে সেটি বিধিসম্মত হবে না। বিষয়টি সরেজমিনে পরিদর্শন ও তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হবে। তদন্তে আইন বা সরকারি নির্দেশনা অমান্যের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বোয়ালিয়া মডেল থানার অফিসার ইন-চার্জ (ওসি) মাছুমা মুস্তারী বলেন, নির্মাণকাজ নিয়ে অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি দেখে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে আপাতত নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা যাতে যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের অবহিত করা হয়েছে। আরডিএর নির্দেশনা ও তদন্তের ভিত্তিতে পরবর্তী প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তবে ছাদ ও কার্নিশ সম্প্রসারণ করে নির্মাণকাজ চালানোর অভিযোগে অভিযুক্ত হোসনে আরা বেগমের বক্তব্য জানতে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের দাবি, বিষয়টি নিয়ে দ্রুত সরেজমিন তদন্ত করে প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ করা হোক এবং অনুমোদিত নকশা ও সরকারি নির্দেশনার বাইরে কোনো নির্মাণকাজ হয়ে থাকলে তা বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করুক।