
এক সময় ঈদের আগের বিকেলগুলো মনে হতো ভীষণ দীর্ঘ। বিকেলে গরুকে ঘাস পাতা খাওয়ানো, দল বেঁধে পাড়ায় পাড়ায় গরু দেখতে যাওয়ার উত্তেজনা, বারবার নতুন জামা ছুঁয়ে দেখা, কিংবা মায়ের বোকা উপেক্ষা করেও বন্ধুদের সাথে শেষ বিকেলের আড্ডায় মেতে ওঠার মাঝে ছিল এক অপার্থিব আনন্দ।
তখন উৎসবের উপর লক্ষ্য গুলোকে হয়তো ছোট ছিল, কিন্তু অনুভূতির গভীরতা ছিল বিশাল। একটা গরু একসেপ্ট নতুন জামা আর ভোরে সবার আগে ঘুম থেকে ওঠার প্রতিযোগিতায় যেন পুরো পৃথিবীকে খুশিতে ভরে দিত। সময়ের আবর্তনে মানুষ বড় হয়। বদলে যায় শহর, জীবন ভরে উঠে বাস্তবতায়। সেই সাথে পরিপক্কতা আসে উৎসব থেকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতেও।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এসে একজন শিক্ষার্থীর কাছে ঈদ মানে এখন আর কেবলই নতুন পোশাকের আনন্দ নয়। বরং তার দীর্ঘ বাস্তবতার পর চেনানির প্যারা, পরিবারের সান্নিধ্য আর চেনা গন্ধ গুলোর মাঝে প্রশান্তি খোঁজার উপলক্ষ্য ক্যাম্পাস ছাড়িয়ে যখন কোন শিক্ষার্থী বাড়ির পথ ধরে তখন তার ব্যাগে শুধু পোশাক থাকে না, সাথে থাকে মাসের পর মাস জমে থাকা ক্লান্তি, অজস্র গল্প আর প্রিয়জনদের কাছে ফেরার এক তীব্র আকুলতা।
কথা হয়েছে বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাথে। শুনবো ছোটবেলার ঈদ স্মৃতিকে কেন্দ্র করে তাদের আবেগ অনুভূতি আর প্রিয়জনদের প্রতি ভালবাসার গল্প।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী কাছে ছোটবেলার ঈদ আনন্দটা ছিল অন্যরকম। নতুন জামা, সালামি আর বন্ধুদের সাথে সারাদিন ঘোরাঘুরি সব কিছুর মধ্যে আলাদা একটা আনন্দ কাজ করত। কিন্তু বড় হয়ে যাওয়ার পর ঈদের আনন্দটা অনেকটাই বদলে গেছে। এখন আগের মত উচ্ছ্বাস, আনন্দ না থাকলেও পরিবারের সাথে সময় কাটানোর শান্তি আর ভালোবাসা টাই বেশি অনুভব করি। ছোটবেলার ঈদ ছিল আনন্দের, আর এখনকার ইফতার বেশিরভাগ স্মৃতির আর দায়িত্বের মধ্যে আটকে গেছে।
ছোটবেলায় ঈদ মানেই ছিল সীমাহীন উত্তেজনা ও আনন্দের ভরপুর। এখন ঈদ আসে অনেক শান্তভাবে। বাস্তবতা আর বাস্তবতার ভিড়ে আগে সেই উচ্ছ্বাসটা আর খুঁজে পাই না। তবুও পরিবারের সঙ্গে একসাথে হওয়াটাই এখন ঈদের সবচেয়ে বড় আনন্দ। ছোটবেলায় ঈদ মানেই ছিল অস্থির অপেক্ষা। তখন কোন চিন্তা ছিল না, শুধু আনন্দই ছিল কিন্তু বড় হওয়ার পর বুঝেছি, ঈদের আনন্দ একই থাকলেও অনুভূতিটা বদলে যায়। এখন অনেক দায়িত্ব, অনেক ব্যস্ততা আর জীবনের নানা চিন্তার কারণে ছোটবেলার মতো সেই নিখাদ আনন্দ আর অনুভব করা যায় না। তাই ঈদে এলে আজও ভালো লাগে, কিন্তু মনটা কোথাও না কোথাও ছোটবেলার সেই দিনগুলোকে খুঁজে বেড়ায়।
তবে অনেকের কাছে বয়স একটি সংখ্যা মাত্র। তাদের ঈদ আনন্দগুলো এখনো রয়ে গেছে আগের মতই। বাড়তি দায়িত্ব আর জীবন চিন্তা তাদের এই ঈদ আনন্দে যোগ করে আরো এক নতুন মাত্রা।
সময়টা অনেক টুকু পেরিয়েছে ঠিকই, কিন্তু গরু আর কোরবানি নিয়ে উন্মাদনটা অপরিবর্তনীয়, ছোটবেলায় কোরবানির পশু তাড়াতাড়ি কিনার জন্য আব্বার তাগাদা দিতাম। এবং কিনে আনার পর গরুটাকে ঠিকমতো খাওয়ানো, গোসল করানো কাজগুলো খুব আনন্দের সাথে করতাম এবং তা আমাকে আনন্দ দিত। এখন হয়তো আগের মত স্কুল ছুটি হলেই চলে যায় না কিন্তু ক্যাম্পাস থেকে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরা হয় না কোরবানির হাটে যাব বলে। হয়তো সময় অনেকটুকু পেরিয়েছে পরিস্থিতি ভিন্ন হয়েছে কিন্তু কোরবানির পশু নিয়ে যে একটা ক্রেস্ট বা আনন্দ তা অমলিনই রয়ে গেছে এবং থাকবে।
শৈশবের সেই বাঁধভাঙ্গা উচ্ছ্বাসে জায়গাটিতে এখন জমা হয়েছে এক নীরব নস্টালজিয়া আর এক টুকরো আত্মিক শান্তি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদের জীবনে ঈদের গল্পগুলো আজ এভাবেই বিবর্তিত। কারও কাছে তা এখনো রঙিন, কারও কাছে স্মৃতির চাদরে মোড়ানো, আবার কারও কাছে তা শুধুই প্রিয় মানুষদের কাছে ফিরে যাওয়ার এক পরম আশ্রয়।