
পর্যটন নগরী কক্সবাজার শহরের দক্ষিণ রুমালিয়ার ছড়া এলাকার সিকদার বাজারে জমিজমা সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে এক নৃশংস ও বর্বরোচিত হামলার ঘটনা ঘটেছে। আপন ছোট ভাইয়ের বসতবাড়িতে অতর্কিত হামলা, ব্যাপক ভাঙচুর এবং ঘরে থাকা নগদ টাকা ও মূল্যবান স্বর্ণালংকার লুটপাটের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে আপন বড় ভাইয়ের বিরুদ্ধে। এই হামলায় গুরুতর আহত ছোট ভাই স্থানীয় প্রশাসনের কাছে জানমালের নিরাপত্তা চেয়ে এবং ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। ঘটনার পর থেকে ভুক্তভোগী পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং এলাকায় এ নিয়ে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার (৫ জুন) সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টার দিকে কক্সবাজার শহরের দক্ষিণ রুমালিয়ার ছড়া সিকদার বাজারের সিকদার ঘোনা এলাকায় এই ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি ঘটে। ভুক্তভোগী ব্যক্তির নাম নুর হোসেন (৪০), তিনি ওই এলাকার বাসিন্দা মৃত মোহাম্মদ ইসলামের সেজ ছেলে। নুর হোসেন তাঁর আপন বড় ভাই মোহাম্মদ হোসেনের বিরুদ্ধে এই সুপরিকল্পিত হামলা, ভাঙচুর এবং ঘর থেকে মালামাল চুরির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনেছেন।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে নুর হোসেনের সঙ্গে তাঁর বড় ভাই মোহাম্মদ হোসেন এবং অপর ছোট ভাই আনোয়ারের পৈতৃক বসতবাড়ির জায়গা-জমি ও সীমানা নিয়ে তীব্র বিরোধ চলে আসছিল। এই সীমানা বিরোধকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে এর আগেও একাধিকবার চরম বাকবিতণ্ডা, হাতাহাতি এবং রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
এলাকাবাসী ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা জানান, জমি নিয়ে ভাইদের এই বিরোধ মেটাতে স্থানীয়ভাবে বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। মাত্র পাঁচ মাস আগেও ঠিক একই বিরোধকে কেন্দ্র করে নুর হোসেনের ওপর মারাত্মক হামলার ঘটনা ঘটেছিল। সেই সময় স্থানীয় মুরব্বি ও সমাজ কমিটির মধ্যস্থতায় একটি সালিশ বৈঠকের আয়োজন করা হয় এবং সাময়িকভাবে বিষয়টি মীমাংসা করার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু বড় ভাই মোহাম্মদ হোসেন স্থানীয় সমাজের সেই সিদ্ধান্ত ও শান্তিশৃঙ্খলা অমান্য করে বারবার নুর হোসেন ও তাঁর পরিবারের ওপর চড়াও হচ্ছিলেন। তারই চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে গত শুক্রবারের এই বর্বর হামলার মাধ্যমে।
ভুক্তভোগী নুর হোসেনের দাবি, মূলত বসতঘরের সীমানা পিলার ভাঙার একটি মিথ্যে ও বানোয়াট অজুহাত তুলে তাঁর বড় ভাই মোহাম্মদ হোসেন বিগত কয়েক দিন ধরে ক্ষুব্ধ হয়ে ছিলেন এবং তাঁকে শায়েস্তা করার সুযোগ খুঁজছিলেন। ঘটনার দিন সন্ধ্যায় যখন নুর হোসেনের পরিবারের কোনো সদস্য বাড়িতে ছিলেন না, সেই শূন্যতার পূর্ণ সুযোগ নেয় হামলাকারীরা। মোহাম্মদ হোসেন ও তাঁর সহযোগীরা মিলে বসতঘরের প্রধান দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে।
ঘরের ভেতরের আসবাবপত্র, আলমারি ও অন্যান্য জিনিসপত্র ভাঙচুর করে এক তাণ্ডবলীলা চালানো হয়। নুর হোসেন অভিযোগ করেন, আলমারির লক ভেঙে ভেতরে রাখা ব্যবসার নগদ ৪০ হাজার টাকা এবং তাঁর স্ত্রীর পরিধেয় ও জমিয়ে রাখা প্রায় দুই ভরি ওজনের স্বর্ণালংকার লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
নুর হোসেন আরও জানান, “সন্ধ্যায় ঘরে হামলা ও ভাঙচুরের খবর পেয়ে আমি যখন দ্রুত বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হই, তখন সিকদার বাজার এলাকায় পৌঁছালে মাঝরাস্তায় আমার বড় ভাই মোহাম্মদ হোসেনের সাথে আমার দেখা হয়। আমি ঘর ভাঙচুরের বিষয়ে তাঁর কাছে জানতে চাইলে তিনি কোনো কিছু না বলেই চরম ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তাঁর হাতে থাকা মোটা লাঠি দিয়ে আমার মাথার ওপর ও শরীরে অতর্কিত ও উপর্যুপরি হামলা চালান। আমার চিৎকারে বাজারের ব্যবসায়ী ও স্থানীয় লোকজন দ্রুত ঘটনাস্থলে এগিয়ে আসলে বড় ভাই মোহাম্মদ হোসেন ও তাঁর সাথে থাকা লোকজন আমাকে খুন করার হুমকি দিয়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।”
পরবর্তীতে উপস্থিত স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় রক্তাক্ত ও আহত নুর হোসেনকে উদ্ধার করে দ্রুত কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে জরুরি বিভাগে প্রাথমিক চিকিৎসা এবং ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ শেষে চিকিৎসকের পরামর্শে তিনি গভীর রাতে বাড়িতে ফিরে আসেন।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী নুর হোসেন চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “পৈতৃক বসতভিটার জায়গা নিয়ে বিরোধের জেরে আমার ওপর বারবার এই ধরনের প্রাণঘাতী হামলা চালানো হচ্ছে। আমার স্ত্রী-সন্তানরা এখন ঘরে ঘুমাতেও ভয় পাচ্ছে। আমি এই সন্ত্রাসী হামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষী বড় ভাইসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পুলিশ প্রশাসনের সর্বোচ্চ হস্তক্ষেপ কামনা করছি।”
এদিকে, ঘটনার পর থেকে এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি হলেও পুরো বিষয়টি নিয়ে অভিযুক্ত বড় ভাই মোহাম্মদ হোসেনের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ঘটনার পর থেকে তিনি পলাতক রয়েছেন নাকি কোনো কৌশলী অবস্থান নিয়েছেন তা স্পষ্ট নয়। প্রতিবেদক একাধিকবার বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তাঁর কোনো মতামত বা প্রতিক্রিয়া জানা সম্ভব হয়নি।
দক্ষিণ রুমালিয়ার ছড়া এলাকার স্থানীয় সচেতন ও সমাজসেবী মহলের মতে, পারিবারিক জমিজমা সংক্রান্ত এই বিরোধ দীর্ঘদিন ধরে ধিকিধিকি জ্বলতে থাকায় পুরো সিকদার ঘোনা এলাকায় একটি থমথমে পরিস্থিতি ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। যেকোনো মুহূর্তে এটি আরও বড় ধরণের রক্তক্ষয়ী সংঘাত বা প্রাণহানির কারণ হতে পারে। তাই বিষয়টি নিয়ে জেলা পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের উচিত কোনো প্রকার পক্ষপাতিত্ব ছাড়া নিরপেক্ষ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করা এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে শান্তি ফিরিয়ে আনা।