
লক্ষ্মীপুর জেলা ও পৌর শহরের সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি দূর করতে এবং শহরকে যানজটমুক্ত করার লক্ষ্যে এক বিশাল উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেছে জেলা প্রশাসন। পৌর এলাকার জনসাধারণের অবাধে চলাচলের প্রধান সড়ক ও ফুটপাত অবৈধ দখলমুক্ত করার অংশ হিসেবে এই বিশেষ মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। অভিযানে নেতৃত্ব দেন লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসনের অত্যন্ত দক্ষ ও চৌকস নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাজিদা আক্তার সূচনা। অভিযানকালে সড়কের ওপর অবৈধভাবে গড়ে ওঠা অসংখ্য দোকানপাট ও স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। একই সাথে রাস্তা দখল করে সাধারণ মানুষের চলাচলে বিঘ্ন ঘটানোর অপরাধে ৬ ব্যবসায়ীকে আর্থিক জরিমানা করা হয়েছে। প্রশাসনের এমন কঠোর পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন লক্ষ্মীপুরের সর্বস্তরের সচেতন নাগরিক সমাজ।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীদের দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ ছিল যে, লক্ষ্মীপুর পৌরসভার প্রধান প্রধান সড়ক ও ফুটপাতগুলো একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জোরপূর্বক দখল করে রেখেছেন। ফুটপাত ছাড়িয়ে মূল সড়ক পর্যন্ত দোকানপাটের মালামাল প্রদর্শন, যত্রতত্র অবৈধ পার্কিং এবং রাস্তার ওপরেই বিভিন্ন নির্মাণ সামগ্রী রাখার কারণে শহরজুড়ে তীব্র যানজট স্থায়ী রূপ নিয়েছিল। বিশেষ করে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, নারী ও বয়োবৃদ্ধদের যাতায়াতে চরম নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে হতো।
জনসাধারণের এই চরম ভোগান্তি এবং নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার বিষয়টি আমলে নিয়ে জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় আজ মঙ্গলবার (০২ জুন) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত পৌর শহরের বুক চিরে এই বিশেষ উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়।
ভ্রাম্যমাণ আদালত সূত্র জানিয়েছে, আজ মঙ্গলবার সকাল থেকেই লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার অত্যন্ত ব্যস্ততম পয়েন্ট ঝুমুর এলাকা থেকে এই উচ্ছেদ কার্যক্রমের সূচনা ঘটে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাজিদা আক্তার সূচনার নেতৃত্বে আভিযানিক দলটি ঝুমুর চত্বর থেকে শুরু করে শহরের প্রাণকেন্দ্র চকবাজার হয়ে বাগবাড়ী এলাকা পর্যন্ত দীর্ঘ সড়কে এক চিরুনি অভিযান পরিচালনা করে।
অভিযান চলাকালে দেখা যায়, সড়কের দুই পাশের ফুটপাত সম্পূর্ণ গ্রাস করে নিয়েছে বিভিন্ন ফলের দোকান, চায়ের টং এবং কাপড়ের দোকান। এমনকি অনেক বহুতল ভবন ও বিপণিবিতানের মালিকেরা আইনকানুন তোয়াক্কা না করে রাস্তার ওপরেই ইট, বালু, পাথর ও রডসহ বিভিন্ন ভারী নির্মাণ সামগ্রী স্তূপ করে রেখেছেন। এর ফলে চার লেনের রাস্তা সংকুচিত হয়ে এক লেনে পরিণত হয়েছিল। ম্যাজিস্ট্রেট তাৎক্ষণিকভাবে শ্রমিকদের সহায়তায় রাস্তার ওপর অবৈধভাবে রাখা সমস্ত ইট ও বালির স্তূপ অপসারণের নির্দেশ দেন এবং ফুটপাতের ওপর থাকা অস্থায়ী অবৈধ দোকানপাট ও শেডগুলো হাতুড়ি দিয়ে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেন।
সড়ক ও ফুটপাত দখল করে জনসাধারণের স্বাভাবিক চলাচলে কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতা এবং তীব্র যানজট সৃষ্টি করার অপরাধে স্পটেই ভ্রাম্যমাণ আদালত বসানো হয়। আইন অমান্যকারী ও ফুটপাত দখলকারী স্থানীয় ০৬ জন ব্যবসায়ী ও ব্যক্তিকে অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে ০৬টি পৃথক মামলায় সর্বমোট ৪,০০০ (চার হাজার) টাকা অর্থদণ্ড বা জরিমানা করা হয়।
জরিমানার টাকা তাৎক্ষণিকভাবে আদায় করার পাশাপাশি দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও আশেপাশের অন্যান্য ব্যবসায়ীদের কঠোরভাবে হুঁশিয়ারি দিয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাজিদা আক্তার সূচনা বলেন, “ফুটপাত ও রাস্তা জনসাধারণের জন্য, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ব্যবসার জায়গা নয়। আইন অমান্য করে রাস্তা দখল করলে আগামীতে আরও বড় অঙ্কের জরিমানা ও কারাদণ্ড প্রদান করা হবে।”
অভিযানটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে পরিচালনা করতে এবং যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে ম্যাজিস্ট্রেট সাজিদা আক্তার সূচনার আভিযানিক দলের সাথে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন বাংলাদেশ পুলিশ এবং বাংলাদেশ আনসার বাহিনীর একঝাঁক সশস্ত্র ও প্রশিক্ষিত সদস্য। একই সাথে লক্ষ্মীপুর পৌরসভার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিগণ উচ্ছেদ কার্যক্রমে কারিগরি ও প্রশাসনিক সহযোগিতা প্রদান করেন। প্রশাসনের এই সমন্বিত ও যৌথ অভিযানের কারণে উচ্ছেদ চলাকালে কোনো প্রকার বাধার সৃষ্টি করতে পারেনি দখলদারেরা।
এদিকে, বছরের পর বছর ধরে বেদখল হয়ে থাকা ফুটপাত ও রাস্তা মুহূর্তের মধ্যে ফাঁকা এবং উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ায় সাধারণ পথচারী ও লক্ষ্মীপুর পৌরবাসীর মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই উচ্ছেদ অভিযানের ফলে শহরের দীর্ঘদিনের যানজট অনেকাংশেই কমে আসবে। তবে সাধারণ মানুষের দাবি, প্রশাসন অভিযান চালিয়ে যাওয়ার পর কিছুদিন না যেতেই আবার ফুটপাত বেদখল হয়ে যায়। তাই এই দখলমুক্ত অবস্থা ধরে রাখতে নিয়মিত মনিটরিং ও জেলা প্রশাসনের কঠোর নজরদারি বজায় রাখা প্রয়োজন।
লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসন ও পৌরসভা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এটি কোনো সাময়িক বা একদিনের লোকদেখানো অভিযান নয়। লক্ষ্মীপুর পৌর শহরকে একটি আধুনিক, পরিচ্ছন্ন, যানজটমুক্ত এবং নিরাপদ শহর হিসেবে গড়ে তুলতে তাঁদের এই উচ্ছেদ অভিযান এবং মোবাইল কোর্টের কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে পৌরসভার প্রতিটি ওয়ার্ড ও জনগুরুত্বপূর্ণ সড়কে নিয়মিত বিরতিতে অব্যাহত থাকবে। কাউকেই জনসাধারণের অধিকার হরণ করে সড়ক বা ফুটপাত দখল করতে দেওয়া হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে প্রশাসন।