
ঈদের অনাবিল আনন্দ ও খুশিকে কেবল নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত, সুবিধাবঞ্চিত ও অসহায় মানুষের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিতে এক ব্যতিক্রমী ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা আইন সহায়তা ফাউন্ডেশন (আসফ)। শনিবার (৬ জুন) মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলায় সংস্থাটির শিবচর শাখা ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের যৌথ উদ্যোগে এক বর্ণাঢ্য ঈদ পুনর্মিলনী এবং বিশেষ মানবিক সহায়তা কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
পবিত্র ঈদুল আজহার আমেজ শেষ হতে না হতেই উৎসবের এই আনন্দকে পুনর্ব্যক্ত করতে শিবচরের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মাঝে ছুটে যান সংগঠনের কর্মীরা। অনুষ্ঠান শেষে উপজেলার শতাধিক অসহায়, দুস্থ, ভবঘুরে, ছিন্নমূল ও শারীরিক-মানসিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য একবেলার উন্নত মানের খাবারের বিশেষ আয়োজন করা হয়। তাদের প্রত্যেকের হাতে তুলে দেওয়া হয় প্যাকেটজাত সুস্বাদু বিরিয়ানি, কোমল পানীয়, বিশুদ্ধ পানি এবং আকর্ষণীয় বিভিন্ন উপহারসামগ্রী।
এর বাইরেও আইন সহায়তা ফাউন্ডেশনের নিবেদিতপ্রাণ স্বেচ্ছাসেবীরা উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের নিজস্ব বসবাসস্থলে স্বশরীরে গিয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন এবং তাদের সামগ্রিক জীবনযাত্রার খোঁজখবর নেন। আসফ-এর এই মানবিক উদ্যোগ স্থানীয় সর্বস্তরের মানুষের মাঝে এক অভূতপূর্ব সাড়া ফেলেছে।
আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা শিবচরের ভৌগোলিক ও সামাজিক বাস্তবতার কথা তুলে ধরেন। পদ্মা নদীর অববাহিকায় অবস্থিত শিবচর উপজেলাটি দীর্ঘদিন ধরে তীব্র নদীভাঙনের শিকার। প্রতি বছরই নদীভাঙনের ফলে শত শত পরিবার গৃহহীন ও ভূমিহীন হয়ে পড়ে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে স্থানীয় অর্থনীতি ও জীবনযাত্রায়। বক্তারা উল্লেখ করেন যে, নদীভাঙনকবলিত শিবচরের অনেক মানুষ এখনও শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও চিকিৎসাসহ মৌলিক মানবিক সেবা থেকে চরমভাবে বঞ্চিত। সমাজে এই পিছিয়ে পড়া ও নিঃস্ব মানুষদের আইনি এবং সামাজিক অধিকার সুপ্রতিষ্ঠা করতে আইন সহায়তা ফাউন্ডেশন (আসফ)-এর কর্মীরা দিনরাত নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও এই ধারা অব্যাহত রাখবে। সমাজে অবহেলিত ভবঘুরে, অসহায় ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমাজের বোঝা না ভেবে, তাদের পাশে দাঁড়ানো এবং মূল স্রোতধারায় ফিরিয়ে আনাই মানবতার প্রকৃত শিক্ষা ও পরম ধর্ম বলে মন্তব্য করেন উপস্থিত আলোচকরা।
শিবচরে আয়োজিত এই বর্ণিল ঈদ পুনর্মিলনী ও মানবিক সহায়তা কর্মসূচীতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আইন সহায়তা ফাউন্ডেশন (আসফ)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সম্মানিত পরিচালক মো. আবুল খায়ের খান। তিনি তাঁর দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যে বলেন, “আইন সহায়তা ফাউন্ডেশন শুধু আইনি সহায়তাই দেয় না, বরং আর্তমানবতার সেবায় যেখানেই সংকট, সেখানেই আসফ-এর কর্মীরা ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। আজকের এই আয়োজন আমাদের নিয়মিত মানবিক কার্যক্রমের একটি অংশ মাত্র। বিত্তবানদের প্রতি আমাদের আহ্বান, আপনারাও যার যার অবস্থান থেকে এই অসহায় মুখগুলোর মুখে হাসি ফোটাতে এগিয়ে আসুন।”
অনুষ্ঠানে স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ের এক বিশাল নেতৃবৃন্দের মিলনমেলা ঘটে। বিশেষ অতিথি ও সংগঠক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন—
শিবচর উপজেলা শাখার সিনিয়র সহ-সভাপতি হুমায়ন কবির,
সাধারণ সম্পাদক সেলিম মোল্লা,
সাংগঠনিক সম্পাদক বাদশা মিয়া,
মহিলা বিষয়ক সম্পাদক সুবর্ণা আক্তার,
মাদবরচর ইউনিয়নের সভাপতি রানু আক্তার ও সাধারণ সম্পাদক সাইদ খান,
রিপা আক্তার,
চান্দেরচর ইউনিয়নের সভাপতি কাজী শহীদ, আনোয়ার হোসেন, মাহাবুব মিয়া ও সাজাহান মিয়া,
চরজানাজাত ইউনিয়নের সভাপতি আতা বেপারী ও সাধারণ সম্পাদক জলিল মিয়া,
মো. আরিফ হোসেন এবং শেখ মাসুদসহ শতাধিক মানবিক স্বেচ্ছাসেবক ও সংগঠনের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী।
আলোচনা সভায় বক্তারা অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “ঈদের আনন্দ বা যেকোনো উৎসবের প্রকৃত খুশি তখনই পূর্ণতা লাভ করে, যখন সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া মানুষটি সেই আনন্দের অংশীদার হতে পারে। আমাদের চারপাশে এমন অনেক অসহায় ও দিনমজুর মানুষ আছেন, যারা ঈদের দিনেও দুমুঠো ভালো খাবার খেতে পারেন না কিংবা নতুন কাপড়ের ছোঁয়া পান না। তাদের এই যন্ত্রণাকে কিছুটা লাঘব করতে এবং তাদের মলিন মুখে ক্ষণিকের জন্য হলেও হাসি ফোটানোর একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস হিসেবেই আসফ এই ব্যতিক্রমী ঈদ পুনর্মিলনীর আয়োজন করেছে।”
বক্তারা তাঁদের বক্তব্যে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, আগামী দিনে শিবচরের ভবঘুরে, পথশিশু, ছিন্নমূল ও নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত বাস্তুচ্যুত মানুষের স্থায়ী পুনর্বাসন এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আরও বৃহৎ ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে কাজ করার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।
নিউজটি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং স্থানীয় সুধী মহলে আইন সহায়তা ফাউন্ডেশনের এই কার্যক্রম ব্যাপক সমাদৃত হচ্ছে। মানবিকতা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক উজ্জ্বল ও অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে স্থানীয় বাসিন্দারা এই ব্যতিক্রমী ঈদ পুনর্মিলনী আয়োজনের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজ মনে করছেন, শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ঈদের পর এভাবে সুবিধাবঞ্চিত ও প্রতিবন্ধীদের খোঁজ নেওয়া এবং তাদের মাঝে উপহার সামগ্রী বিতরণ করার এই উদ্যোগ অন্যান্য সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর জন্য একটি বড় অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। উপহার পেয়ে দুস্থ ও প্রতিবন্ধী মানুষগুলোর চোখের কোণে ফুটে ওঠা আনন্দাশ্রু ছিল এই আয়োজনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা।