
সরকারি প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র ও সর্বোচ্চ সুরক্ষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত সচিবালয় এবং এর আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। কিছুদিন আগেই সচিবালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীর অতি গোপনীয় ও স্পর্শকাতর ‘লাল টেলিফোন’-এর তার চুরির চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছিল। সেই রেশ কাটতে না কাটতেই এবার প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে এক কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ল্যাপটপ চুরির ঘটনা ঘটেছে। চাঞ্চল্যকর এই চুরির ঘটনার পর মন্ত্রণালয়ের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও বহিরাগতদের প্রবেশাধিকার নিয়ে নানা প্রশ্ন ও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
মঙ্গলবার (৯ জুন) ভরদুপুরে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ১৬ তলা থেকে মো. ইমামুল হাফিজ নাদিমের ব্যক্তিগত ব্যবহৃত এইচপি (HP) ব্র্যান্ডের ল্যাপটপটি চুরি হয়। ভুক্তভোগী ইমামুল হাফিজ নাদিম প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ক) ড. মো. শাকিরুল ইসলাম খান শাকিলের একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার দপ্তর থেকে এভাবে দিনের আলোতে ল্যাপটপ চুরির ঘটনায় পুরো মন্ত্রণালয় জুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
যেভাবে ঘটল চুরির ঘটনা: মন্ত্রণালয়ের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে জানা গেছে, ঘটনার সময় প্রবাসী কল্যাণ ভবনের ১৬ তলায় এক অন্যরকম পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। দুপুরের দিকে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. মো. শাকিরুল ইসলাম খানের কক্ষে প্রবেশ করেন তার একান্ত সচিব ইমামুল হাফিজ নাদিম। তিনি ল্যাপটপটি তার নিজস্ব টেবিলের ওপর রেখে মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য বিশেষ সহকারীর রুমে গিয়েছিলেন। কিন্তু মাত্র পাঁচ মিনিট পর নিজের কক্ষে ফিরে এসে তিনি দেখেন, টেবিলে রাখা সাধের এইচপি ল্যাপটপটি গায়েব হয়ে গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চুরির ঘটনার ঠিক ওই সময়টিতে ভবনটিতে বিদ্যুৎ ছিল না (লোডশেডিং চলছিল)। বিদ্যুৎ না থাকার কারণে করিডোর ও আশপাশের এলাকা কিছুটা অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল। এছাড়া ওই সময় বিশেষ সহকারীর কক্ষের বাইরে দর্শনার্থী ও বিভিন্ন তদবিরকারীদের প্রচুর লোকসমাগম ছিল। ল্যাপটপটি না পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে চারদিকে খোঁজাখুঁজি ও হইচই শুরু হয়। কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা মিলে পুরো ফ্লোরে ব্যাপক তল্লাশি চালালেও শেষ পর্যন্ত ল্যাপটপটি আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দপ্তর ও সিসিটিভি ফুটেজ: খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রবাসী কল্যাণ ভবনের যে ১৬ তলা থেকে ল্যাপটপটি চুরি হয়েছে, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ফ্লোর। একই তলায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) মাহাদী আমিন এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরের দপ্তর অবস্থিত। এত ভিভিআইপি (VVIP) এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের দপ্তরের পাশ থেকে ল্যাপটপ চুরির ঘটনাটি নিরাপত্তার বড় ধরনের গলদ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
ল্যাপটপ চুরির খবর পাওয়ার পর পরই ভবনের নিরাপত্তা দায়িত্বে থাকা কর্মীরা নড়েচড়ে বসেন। তারা তাৎক্ষণিকভাবে ভবনের সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ পর্যালোচনা শুরু করেন। সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করে দেখা যায়, খয়েরি রঙের শার্ট এবং ধূসর রঙের প্যান্ট পরিহিত আনুমানিক ৪৫ থেকে ৫০ বছর বয়সী এক মধ্যবয়সী ব্যক্তি একটি কালো ব্যাগ কাঁধে নিয়ে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ওই দপ্তর থেকে বের হয়ে যাচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নিরাপত্তা কর্মীদের ধারণা, ওই ব্যক্তির কাঁধে থাকা কালো ব্যাগের ভেতরেই চুরি হওয়া ল্যাপটপটি লুকানো ছিল।
গুরুত্বপূর্ণ নথি ফাঁসের আশঙ্কা: এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারীর একান্ত সচিবের ল্যাপটপ হওয়ায় এর ভেতরে সরকারের ও মন্ত্রণালয়ের অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর ডিজিটাল নথি (Documents) থাকার সম্ভাবনা রয়েছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের বৈদেশিক কর্মসংস্থান সংক্রান্ত বিভিন্ন নীতি নির্ধারণী ফাইল, গুরুত্বপূর্ণ ইমেইল ও ডাটাবেজ ওই ল্যাপটপে থাকতে পারে। ফলে ল্যাপটপটি চুরির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো গোপন তথ্য ও নথি অপব্যবহারের বা ফাঁসের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা সামগ্রিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।
১৬ তলার নিরাপত্তা ঘাটতি ও কর্মকর্তাদের ক্ষোভ: নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও কর্মচারী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ভবনের ১৬ তলায় শৃঙ্খলা পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই অত্যন্ত দুর্বল। এটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর এলাকা হওয়া সত্ত্বেও এখানে যে কেউ অনায়াসে প্রবেশ করতে পারে। প্রতিদিন কোনো প্রকার কঠোর স্ক্রিনিং বা পাস ছাড়াই বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থী, দালাল ও তদবিরকারীর উপস্থিতি থাকে এখানে। ফলে প্রতিনিয়তই এখানে এক ধরনের বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়ে থাকে।
কর্মকর্তারা আরও জানান, লিফট থেকে নামার পরই দর্শনার্থীদের আটকানোর জন্য কোনো আধুনিক নিরাপত্তা বলয় বা কার্যকর কোনো চেকপোস্ট নেই। লিফট থেকে বের হয়েই সরাসরি করিডোরে প্রবেশ করা যায় এবং সেখান থেকে সহজেই কর্মকর্তাদের কক্ষে ঢোকা সম্ভব। কোনো প্রকার ডিজিটাল আইডি কার্ড পাঞ্চিং বা কঠোর নজরদারি না থাকায় এই পুরো ফ্লোরের দপ্তরগুলো কার্যত চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
জনবল সংকটের অজুহাত নিরাপত্তা ইনচার্জের: এই চুরির ঘটনা এবং নিরাপত্তা গাফিলতির বিষয়ে জানতে চাইলে প্রবাসী কল্যাণ ভবনের নিরাপত্তা ইনচার্জ পিসি আশরাফুল আলম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, “ঘটনাটি জানার পরপরই আমরা সতর্ক অবস্থান নিই এবং ভবনে উপস্থিত সন্দেহভাজন সবার ব্যাগ তল্লাশি করি। তবে ততক্ষণে হয়তো চোর ভবন ত্যাগ করেছে।”
নিরাপত্তা দুর্বলতার অভিযোগের জবাবে তিনি জনবল সংকটের বিষয়টি সামনে এনে বলেন, “আমাদের জনবল অত্যন্ত সীমিত। পুরো ভবনের বিশাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাত্র ২২ জন আনসার সদস্য শিফটিং ডিউটিতে দায়িত্ব পালন করেন। এত বড় ভবনের নিরাপত্তার তুলনায় এই জনবল খুবই সামান্য। সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।”
সার্বিক বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য ল্যাপটপ হারানো কর্মকর্তা ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারীর একান্ত সচিব মো. ইমামুল হাফিজ নাদিমের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এই ঘটনায় থানায় কোনো সাধারণ ডায়েরি (GD) বা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে। তবে এই চুরির ঘটনাটি প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক ও নিরাপত্তার অভাববোধ তৈরি করেছে।