
মুখে ঘা বা আলসারের সমস্যায় কমবেশি ভোগেননি—এমন মানুষ মেলা ভার। দেখতে ছোটখাটো বা মামুলি সমস্যা মনে হলেও এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যে পরিমাণ অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তা ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। একবার মুখে ঘা হলে সাধারণ কথাবার্তা বলা, ঠিকমতো খাবার খাওয়া, এমনকি প্রিয় ঝাল বা মশলাযুক্ত খাবার উপভোগ করাও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে দ্রুত এই যন্ত্রণা থেকে আরাম পেতে আমরা অনেকেই নানা ধরনের ঘরোয়া টোটকা বা বাজারচলতি জেলের আশ্রয় নিই।
সাধারণত মুখের ভেতরের এই আলসার বা ঘা এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে নিজে থেকেই সেরে যায়। আর এই কারণেই অনেকে বিষয়টিকে তেমন একটা গুরুত্ব দিতে চান না। তবে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান ও বিশেষজ্ঞদের মতে, মুখের ঘাকে এভাবে অবহেলা করা কখনো কখনো বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে।
সম্প্রতি ভারতের একটি খ্যাতনামা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ইন্টারনাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অনিকেত মুলে এ বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য ও সতর্কতা প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, মুখের ঘা সব সময় কেবল একটি সাধারণ সমস্যা নাও হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এটি শরীরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা কোনো গুরুতর রোগ বা জটিল স্বাস্থ্য সমস্যার প্রাথমিক ইঙ্গিত বা পূর্বাভাস বহন করে। তাই ঘন ঘন মুখে ঘা হওয়া কিংবা একটি ঘা দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী হলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
আমাদের অসচেতনতা এবং লাইফস্টাইলের কিছু ভুলের কারণেই মূলত মুখে প্রাথমিক স্তরের ঘা দেখা দেয়। চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদদের মতে, মুখের ঘা হওয়ার পেছনে প্রধানত নিচের কারণগুলো দায়ী থাকে:
মানসিক চাপ ও অনিদ্রা: অতিরিক্ত মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে না ঘুমানোর ফলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সাময়িকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, যা মুখে আলসার তৈরি করতে পারে।
অসাবধানতা: খাবার খাওয়ার সময় বা তাড়াহুড়ো করে কথা বলার সময় অসাবধানতাবশত গালে বা জিভে কামড় লাগলে সেখানে ঘা হতে পারে। এছাড়া শক্ত টুথব্রাশের আঘাতেও মুখের নরম চামড়া ছিলে গিয়ে ঘা হতে পারে।
খাদ্যাভ্যাস: অতিরিক্ত পরিমাণে ঝাল, টক, বা অতিরিক্ত মশলাযুক্ত খাবার খাওয়ার অভ্যাস মুখের ভেতরের অংশকে সংবেদনশীল করে তোলে, যা পরবর্তীতে ঘায়ের রূপ নেয়।
ডিহাইড্রেশন বা পানির ঘাটতি: প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান না করলে শরীর ডিহাইড্রেশনের শিকার হয়। এর ফলে মুখের লালা বা স্যালাইভা উৎপাদন কমে যায় এবং মুখের ভেতরের অংশ শুষ্ক হয়ে ঘা হওয়ার প্রবণতা বাড়ে।
ভিটামিন ও পুষ্টির অভাব: সুষম খাদ্যের অভাব এবং শরীরে প্রয়োজনীয় ভিটামিন বা খনিজের ঘাটতি থাকলে খুব দ্রুত মুখে আলসার দেখা দেয়।
মুখের ভেতরের স্বাস্থ্যকে অনেক সময় পুরো শরীরের আয়না বলা চলে। ভেতরের কোনো অঙ্গ বা সিস্টেমে বড় কোনো সমস্যা তৈরি হলে, তার পূর্বাভাস অনেক সময় মুখের ঘায়ের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বারবার মুখে ঘা হওয়া নিচের রোগ বা জটিলতার লক্ষণ হতে পারে:
১. পুষ্টিহীনতা ও রক্তস্বল্পতা: শরীরে ভিটামিন বি১২ (Vitamin B12), আয়রন (Iron) বা ফোলেটের (Folate) মতো অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উপাদানের ঘাটতি থাকলে মুখে বারবার আলসার দেখা দেয়। এটি মূলত অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতারও ইঙ্গিত হতে পারে। ২. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার সমস্যা (Immune Disorders): শরীরের ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যদি নিজের কোষকেই আক্রমণ করা শুরু করে (যেমন- অটোইমিউন ডিজিজ বা লুপাস), তবে তার প্রথম বহিঃপ্রকাশ ঘটতে পারে মুখে ক্রনিক ঘায়ের মাধ্যমে। ৩. মেটাবলিক ও পরিপাকতন্ত্রের রোগ: সিলিয়াক ডিজিজ (Celiac Disease) কিংবা ক্রোনস ডিজিজ (Crohn’s Disease) বা আইবিডির (IBD) মতো পরিপাকতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি ক্রনিক রোগের সংকেত হিসেবেও মুখে ঘা দেখা দেয়। ৪. মুখের ক্যানসার: এটি সবচেয়ে আশঙ্কাজনক কারণ। দীর্ঘদিন ধরে কোনো ঘা না শুকালে এবং তা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকলে তা ওরাল ক্যানসার বা মুখের ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে।
চিকিৎসক অনিকেত মুলে জানিয়েছেন, মুখের ঘা যদি স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী দু-এক সপ্তাহের মধ্যে নিজে থেকেই মিলিয়ে যায়, তাহলে চিন্তার কিছু নেই। কিন্তু যদি ঘা ঠিক না হয়ে নিচের লক্ষণগুলো দেখা যায়, তবে দেরি না করে অবিলম্বে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে:
যদি মুখের ঘা দুই থেকে তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে একটানা স্থায়ী থাকে এবং কোনো ওষুধ বা টোটকায় না কমে।
যদি ঘা বারবার হতে থাকে, অর্থাৎ একটি ভালো হওয়ার আগেই আরেকটি শুরু হয়।
যদি ঘায়ের আকার দিন দিন অস্বাভাবিকভাবে বড় হতে থাকে।
যদি ঘা বা আলসারের স্থান থেকে কোনো কারণ ছাড়াই রক্ত বের হতে থাকে।
ঘায়ের পাশাপাশি যদি ক্রমশ মুখে তীব্র ব্যথা, খাবার গিলতে বা চিবোতে চরম অসুবিধা হয়।
কোনো প্রকার ডায়েট বা ব্যায়াম ছাড়াই যদি হঠাৎ শরীর থেকে ওজন কমতে শুরু করে।
ঘায়ের সাথে সাথে যদি শরীরে মৃদু বা তীব্র জ্বর এবং অতিরিক্ত ক্লান্তি বা দুর্বলতা দেখা দেয়।
আমাদের দেশের একটি বড় প্রবণতা হলো, মুখে ঘা হলেই আমরা ডাক্তারের কাছে না গিয়ে নিকটস্থ ফার্মেসি বা দোকান থেকে কোনো একটা জেল বা মলম কিনে এনে ব্যবহার করি। অথবা বিভিন্ন ঘরোয়া টোটকা যেমন—মধু, লবঙ্গ তেল বা হলুদ লাগাতে শুরু করি। চিকিৎসকদের মতে, এসব প্রাথমিক পদক্ষেপে হয়তো সাময়িক সময়ের জন্য ব্যথা বা জ্বালাপোড়া থেকে স্বস্তি মিলতে পারে, কিন্তু এটি কোনো পরিপূর্ণ বা স্থায়ী চিকিৎসা নয়।
যদি ঘায়ের পেছনে শরীরের ভেতরের কোনো বড় রোগ দায়ী থাকে, তবে এই সাময়িক স্বস্তির আড়ালে রোগটি ভেতরে ভেতরে আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে। ফলে পরবর্তীতে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই ঘার স্থায়িত্ব এবং তীব্রতার ওপর নির্ভর করে সচেতন হতে হবে। ঘা ঠিক হওয়ার পরিবর্তে যদি বাড়তে থাকে বা নতুন কোনো জটিলতা দেখা দিতে থাকে, তবে অবহেলা না করে অবশ্যই একজন রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের কাছে গিয়ে সঠিক কারণ পরীক্ষা করে চিকিৎসা নেওয়া উচিত। মনে রাখবেন, সামান্য সচেতনতাই বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে আপনাকে ও আপনার পরিবারকে রক্ষা করতে পারে।