
নার্গিস আক্তার, জেলা প্রতিনিধি (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)
নবীনগর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলায় অসাবধানতাবশত পুকুরের পানিতে ডুবে মো. আমজাদ হোসেনের একমাত্র সন্তান (১১) এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। আজ শুক্রবার (১৫ মে, ২০২৬) বেলা ১১টার দিকে উপজেলার আলিয়াবাদ পৌরসভা এলাকায় এই হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনাটি ঘটে। পরিবারের চোখের মণি ও একমাত্র পুত্রসন্তানকে হারিয়ে পুরো পরিবার এখন দিশেহারা ও বাকরুদ্ধ। এই আকস্মিক মৃত্যুর খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় উৎসুক জনতা ও প্রতিবেশীদের মাঝে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে।
পারিবারিক ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, আজ সকাল থেকেই শিশুটি বাড়ির আশেপাশে খেলাধুলা করছিল। বেলা ১১টার দিকে পরিবারের সদস্যদের অলক্ষ্যে ও অসাবধানতাবশত সে বাড়ির ঠিক পাশেই অবস্থিত একটি গভীর পুকুরের পাড়ে চলে যায়। কোনো এক মুহূর্তে পা পিছলে বা ভারসাম্য হারিয়ে সে পুকুরের গভীর পানিতে পড়ে তলিয়ে যায়।
বেশ কিছু সময় ধরে শিশুটিকে বাড়ির উঠানে বা আশেপাশে দেখতে না পেয়ে পরিবারের লোকজন তাকে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে পুকুরের পানিতে শিশুটির দেহ ভেসে উঠতে দেখেন এক প্রতিবেশী। তাঁর চিৎকারে পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দারা ছুটে এসে দ্রুত পুকুর থেকে শিশুটিকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করেন।
পুকুর থেকে উদ্ধারের পরপরই সময় নষ্ট না করে স্থানীয়দের সহায়তায় শিশুটিকে দ্রুত নবীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক শিশুটিকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর অত্যন্ত দুঃখের সাথে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালে নিয়ে আসার আগেই অতিরিক্ত পানি পেটে চলে যাওয়া এবং শ্বাসনালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে শিশুটির মৃত্যু হয়েছিল। একমাত্র সন্তানের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার পর হাসপাতালের করিডোরেই কান্নায় ভেঙে পড়েন বাবা আমজাদ হোসেনসহ আত্মীয়-স্বজনরা। তাঁদের আহাজারিতে হাসপাতালের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।
নিহত শিশুটি ছিল মো. আমজাদ হোসেনের একমাত্র ছেলে। তাকে ঘিরেই ছিল পরিবারের সব স্বপ্ন ও আশা-আকাঙ্ক্ষা। ফুটফুটে এই শিশুটির এমন অকাল ও আকস্মিক মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তাঁর মা-বাবা। প্রতিবেশীরা জানান, ছেলেটি অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের ছিল। পুরো এলাকায় সে সবার আদরের ছিল।
এদিকে খবর পেয়ে এলাকার শত শত মানুষ নিহতের বাড়িতে ভিড় জমান। এই ঘটনায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তাঁরা শোকসন্তপ্ত পিতা-মাতার প্রতি গভীর সমবেদনা জানান এবং মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।
স্থানীয় সুধীসমাজ ও সমাজকর্মীরা এই ঘটনার পর মফস্বল এলাকায় শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁরা বলছেন, গ্রামাঞ্চল ও পৌরসভা এলাকার বাড়ির আশেপাশের পুকুর বা জলাশয়গুলো শিশুদের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে গরমের দিনে বা খেলাধুলার সময়ে শিশুরা অভিভাবকদের চোখ ফাঁকি দিয়ে জলাশয়ের কাছে চলে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষা মৌসুমের আগে এবং এই সময়ে শিশুদের প্রতি অতিরিক্ত নজরদারি রাখা প্রয়োজন। বাড়ির আশেপাশে উন্মুক্ত পুকুর থাকলে সেগুলোর চারপাশে অন্তত বাঁশের বেড়া বা নিরাপত্তা বেষ্টনী দেওয়া উচিত। চাইল্ড কেয়ার বা পারিবারিক সচেতনতাই পারে এমন অসংখ্য অবুঝ শিশুর প্রাণ অকালে ঝরে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং আজ বাদ আসর স্থানীয় কবরস্থানে তাঁর দাফন সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।