
আরমান হোসেন ফয়সাল, লোহাগাড়া প্রতিনিধি (চট্টগ্রাম)
চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের চন্দনাইশ ও লোহাগাড়া রাজনীতির সমীকরণ দ্রুতই বদলে যাচ্ছে। একসময়ের প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) দুর্গে একের পর এক বড় ধরনের ধস নামছে। দলটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমেদের বেইমানি ও রাজনৈতিক ইউ-টার্নের চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে পুরো দলকে। চন্দনাইশের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য (এমপি) জসিম উদ্দীন আহমেদের হাত ধরে এলডিপির হাজার হাজার তৃণমূল নেতাকর্মী আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দিচ্ছেন। আজ রবিবার (১৭ মে, ২০২৬) চন্দনাইশে আয়োজিত এক বিশাল যোগদান অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দলটির এই রাজনৈতিক ভাঙন ও গণযোগদান সম্পন্ন হয়। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মোনাফেকি ও ভুল রাজনৈতিক কৌশলের কারণে অলি আহমেদের নিজের জন্মভূমিতেই এখন বিএনপির সুবাতাস বা ‘বিএনপি বসন্ত’ বইতে শুরু করেছে।
রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) অন্যতম প্রভাবশালী ও নীতি-নির্ধারক নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন বীর বিক্রম কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ। তবে ২০০৬ সালের দিকে অভ্যন্তরীণ নানা সমীকরণে তিনি বিএনপি থেকে বের হয়ে এসে ‘লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)’ নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন। দল গঠনের সময় দেশজুড়ে বড় ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব ফেলার স্বপ্ন দেখলেও, বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে দেখা যায় এলডিপির রাজনৈতিক অস্তিত্ব কেবল অলির নিজস্ব এলাকা চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ-লোহাগাড়া আংশিক) আসনেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। এককভাবে দেশের রাজনীতিতে কোনো সুবিধা করতে না পেরে পরবর্তী সময়ে অস্তিত্ব রক্ষার্থে তিনি পুনরায় নির্বাচনী জোটে বিএনপির সাথেই ভিড়ে যান। মূলত বিএনপির রাজনৈতিক দয়া ও সমর্থনের ওপর ভর করেই এলডিপি টিকে ছিল। পরবর্তীতে দলটির মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদের ব্যক্তিগত প্রভাবের কারণে কুমিল্লার চান্দিনায় এলডিপি কিছুটা রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল। অলি আহমেদের একনায়কতান্ত্রিক মনোভাব এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অদূরদর্শিতার কারণে দলে দ্রুতই ফাটল ধরে। এলডিপির অন্যতম শীর্ষ নেতা শাহাদাৎ হোসেন সেলিমসহ বেশ কয়েকজন সিনিয়র কেন্দ্রীয় নেতার হাত ধরে মূল এলডিপি ভেঙে আরেকটি নতুন এলডিপি গঠিত হয়। একের পর এক ভাঙন এবং সিনিয়র নেতাদের দলত্যাগে দিশেহারা হয়ে পড়েন অলি আহমেদ। ফলে ধীরে ধীরে দলটি দেশজুড়ে সম্পূর্ণ অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ার উপক্রম হয়।
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে। রাজনৈতিক জীবনে অলি আহমেদ সবসময় জামায়াতে ইসলামীর তীব্র সমালোচনা ও গালিগালাজ করলেও, শেষ সময়ে এসে তিনি নিজের আদর্শ বিসর্জন দিয়ে সেই জামায়াতের সাথেই গোপনে ও প্রকাশ্যে জোট গঠন করেন। অলির এই চূড়ান্ত রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন বা ‘মোনাফেকি’ মেনে নিতে পারেননি দলের সাধারণ নেতাকর্মীরা। এই চরম অনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সহচর এবং দলটির মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদ এলডিপি ছেড়ে সগৌরবে বিএনপিতে ফিরে আসেন। মহাসচিবের দলত্যাগের পর অলি আহমেদ কার্যত একা ও নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়েন।
কর্নেল অলির পতনের ইতিহাস এখানেই শেষ নয়। চন্দনাইশের যে মাটি ও মানুষ একসময় নেতা কিংবা অভিভাবক বলতে অন্ধের মতো কেবল অলি আহমেদকেই বুঝতো, সেই চন্দনাইশের জনগণও তাঁর এই রাজনৈতিক বেইমানি ও সুবিধাবাদের চূড়ান্ত জবাব দিয়েছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হওয়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চন্দনাইশের ভোটাররা অলি আহমেদকে ব্যালটের মাধ্যমে প্রত্যাখ্যান করেছেন। নিজের দুর্গ এবং জন্মভূমিতেই বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন অলি আহমেদ। নির্বাচনে এই ঐতিহাসিক পরাজয়ের পর থেকেই চন্দনাইশের সাধারণ মানুষ ও এলডিপির নেতাকর্মীরা অলির থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেন। যে এলডিপির একমাত্র অস্তিত্বের ভিত্তি ছিল চন্দনাইশ, তা এখন পুরোপুরি বিলুপ্তির পথে।
নির্বাচনের পর পরই চন্দনাইশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট আমূল বদলে গেছে। চন্দনাইশের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য জসিম উদ্দীন আহমেদের দূরদর্শী নেতৃত্ব ও জনপ্রিয়তায় উদ্বুদ্ধ হয়ে এলডিপির তৃণমূল থেকে শুরু করে উপজেলা ও পৌরসভা পর্যায়ের হাজার হাজার নেতাকর্মী দলত্যাগ করছেন। আজ ১৭ মে চন্দনাইশে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি এমপি জসিম উদ্দীন আহমেদের হাতে ফুলের তোড়া দিয়ে এলডিপির বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগদান করেন। নব্য যোগদানকারী নেতারা জানান, অলি আহমেদের ভুল নীতি ও জামায়াত প্রীতির কারণে এলডিপিতে থাকার আর কোনো নৈতিক অধিকার তাদের নেই। চন্দনাইশের উন্নয়ন এবং জাতীয় রাজনীতিতে ভূমিকা রাখতে তারা বিএনপির পতাকাতলে শামিল হয়েছেন। আজ চন্দনাইশ জুড়েই বইছে বিএনপির নতুন জোয়ার। স্থানীয় সুধী সমাজ মনে করছে, কর্নেল অলির চন্দনাইশ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটিয়ে এই অঞ্চলে এখন স্থায়ীভাবে আসন গেড়েছে ‘বিএনপি বসন্ত’।