
*আলীকদমে মতবিনিময় ও আইন-শৃঙ্খলা সভা*
হাম নিয়ন্ত্রণ, হাসপাতাল নির্মাণ ও পরিবেশ রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগের ঘোষণা
মুহাম্মদ সালাহ্ উদ্দীন, আলীকদম:
দুর্গম পাহাড়ি জনপদ আলীকদমের স্বাস্থ্যসেবা, আইন-শৃঙ্খলা ও পরিবেশ সুরক্ষাকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হয়েছে এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় ও আইন-শৃঙ্খলা সভা। সভায় স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা, হেডম্যান-কার্বারী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা অংশ নিয়ে উপজেলার সামগ্রিক উন্নয়ন ও চলমান সংকট মোকাবিলায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
সোমবার (১৮ মে) সকালে আলীকদম উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে আয়োজিত এ সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বান্দরবান-৩০০ নং সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্য রাজপুত্র সাচিং প্রু জেরি। সভাপতিত্ব করেন আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনজুর আলম।
সভায় উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, স্বাস্থ্য বিভাগ, কৃষি বিভাগ, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, সেনাবাহিনীর প্রতিনিধি, জনপ্রতিনিধি, হেডম্যান-কার্বারী ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অংশগ্রহণ করেন।
হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় জোরালো পদক্ষেপ
সভায় সম্প্রতি কুরুকপাতা ইউনিয়নের দুর্গম এলাকায় ছড়িয়ে পড়া হাম পরিস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব পায়। আক্রান্ত এলাকায় চিকিৎসা কার্যক্রম আরও জোরদার করতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বিত কার্যক্রম অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এছাড়া দুর্গম পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সপ্তাহব্যাপী নিয়মিত চিকিৎসক পাঠানোর উদ্যোগের কথাও জানানো হয়। সভায় বক্তারা বলেন, স্বাস্থ্যসেবাকে টেকসই করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিকল্প নেই।
কুরুকপাতা ও পোয়ামুহুরীতে হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ
সভায় জানানো হয়, কুরুকপাতা ও পোয়ামুহুরী এলাকায় হাসপাতাল নির্মাণের লক্ষ্যে স্থানীয়ভাবে দুই একর জমি দানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করতে সাধারণ মানুষের মাঝে স্বাস্থ্য কার্ড এবং কৃষকদের জন্য কৃষি কার্ড বিতরণ কার্যক্রম চালুর বিষয়েও আলোচনা হয়।
নদী, বন ও পাহাড় রক্ষায় কঠোর অবস্থান
পরিবেশ সংরক্ষণকে সভায় অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরা হয়। মাতামুহুরী, সাঙ্গু ও বাকখালী নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে পাহাড়ি ঝিরি সংরক্ষণ, বনভূমি রক্ষা এবং জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে প্রশাসনিক তৎপরতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়।
সভায় অবৈধভাবে বালু, পাথর ও গাছ উত্তোলনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দেওয়া হয়। হেডম্যান ও কার্বারীদের জুম চাষে পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রেখে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়।
“১৪টি জাতিসত্ত্বাকে সঙ্গে নিয়েই এগোতে হবে”
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য সাচিং প্রু জেরি বলেন, পাহাড়ের উন্নয়নকে টেকসই করতে অর্থনীতি, পানি সম্পদ ও পর্যটন খাতকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে। তিনি বলেন,
“১৪টি জাতিসত্ত্বাকে সঙ্গে নিয়েই উন্নয়নের পথ তৈরি করতে হবে। আমরা সবাই এক পরিবারের সদস্যের মতো সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে চাই।”
তিনি আরও বলেন, জনগণের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিয়েই উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে এবং প্রশাসন ও রাজনৈতিক কর্মীদের দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে হবে।
এ সময় তিনি পরিবেশ রক্ষায় নদী ও ঝিরি থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে কঠোর নজরদারির কথাও উল্লেখ করেন।
সভা শেষে অংশগ্রহণকারীরা মত দেন, দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও পরিবেশ সুরক্ষায় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় জনগণের সমন্বিত উদ্যোগই হতে পারে টেকসই উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি।