
আব্দুর রহমান, স্টাফ রিপোর্টার (কুষ্টিয়া)
ভেড়ামারা, কুষ্টিয়া: কুষ্টিয়া জেলার ভেড়ামারা উপজেলার প্রান্তিক, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মাঝে উন্নত এবং মানসম্মত চক্ষু চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে এক ব্যতিক্রমী মানবিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। উপজেলার সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের চোখের আলো ধরে রাখতে এবং দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতা দূর করতে শুরু হয়েছে “বিনামূল্যে লেন্স সংযোজন ও চক্ষু চিকিৎসা শিবির-২০২৬”। রবিবার (১৭ মে ২০২৬) সকাল ১০টায় অত্যন্ত উৎসবমুখর ও আবেগঘন পরিবেশে ভেড়ামারা ডায়াবেটিস সেন্টার প্রাঙ্গণে এই সেবামূলক চিকিৎসা শিবিরের আনুষ্ঠানিক শুভ উদ্বোধন করা হয়। প্রথম দিনেই চিকিৎসা সেবা নিতে স্থানীয় ও দূর-দূরান্ত থেকে আসা শত শত চোখ ও হৃদরোগে আক্রান্ত মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। ভেড়ামারা ডায়াবেটিস সেন্টারের বিশেষ এই চিকিৎসা শিবিরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় জননন্দিত ব্যক্তিত্ব এবং মাননীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব আব্দুল গফুর। তিনি ফিতা কেটে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ক্যাম্পের উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য আলহাজ্ব আব্দুল গফুর বলেন, “চোখ মানুষের শরীরের সবচেয়ে মূল্যবান অঙ্গ এবং মহান আল্লাহর এক অপরূপ নেয়ামত। অথচ আমাদের সমাজে অর্থাভাব এবং সচেতনতার অভাবে অনেক দরিদ্র মানুষ সময়মতো চোখের সঠিক চিকিৎসা করাতে পারেন না। ছানির মতো সাধারণ সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে অনেকেই চিরতরে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে অন্ধত্বের দিকে ধাবিত হন। সেইসব সুবিধাবঞ্চিত এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে ভেড়ামারা ডায়াবেটিস সেন্টারের এই মানবিক ও সেবামূলক উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। বর্তমান সময়ে স্বাস্থ্যসেবাকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি ও সামাজিক এই উদ্যোগগুলো দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যখাতকে আরও সমৃদ্ধ করবে।” তিনি ভবিষ্যতেও সমাজের কল্যাণে এই ধরণের বড় পরিসরের আয়োজন অব্যাহত রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ডক্টর নূরুল আমীন জসিম। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, সমাজের প্রতিটি মানুষ যেন সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার অধিকার পায়, তা নিশ্চিত করা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব। স্বাস্থ্যখাতে কেবল চিকিৎসার সুযোগ বাড়ালেই হবে না, বরং প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের মাঝে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সেবার মান উন্নত করা সমানভাবে প্রয়োজন। আজকের এই লেন্স সংযোজন শিবির একটি বিশুদ্ধ মানবকল্যাণমূলক উদ্যোগ, যা শত শত পরিবারের মুখে হাসি ফোটাবে।”
অনুষ্ঠানে সম্মানিত চিকিৎসকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রখ্যাত চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. গাজী আশিক বাহার। তিনি চিকিৎসাসেবা প্রদান ও লেন্স সংযোজনের বিভিন্ন কারিগরি ও আধুনিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে অতিথিদের অবহিত করেন। এছাড়াও ভেড়ামারা উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের ব্যক্তিবর্গ এবং ভেড়ামারা উপজেলা জামায়াত-এর স্থানীয় নেতৃবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে এই উদ্যোগের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করেন। উদ্বোধনী পর্বের পরপরই ডা. গাজী আশিক বাহারের নেতৃত্বে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত শত শত রোগীদের প্রাথমিক চোখ পরীক্ষা ও পরামর্শ প্রদান শুরু করেন। আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই শিবিরে চোখের ছানি পড়া রোগীদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে লেন্স সংযোজন (IOL) অপারেশন করা হবে। একই সাথে প্রয়োজন অনুযায়ী রোগীদের বিনামূল্যে ওষুধ, ড্রপ এবং প্রয়োজনীয় চশমাও বিতরণ করা হচ্ছে।
চিকিৎসা নিতে আসা ষাটোর্ধ্ব আমেনা বেগম আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “টাকার অভাবে দীর্ঘদিন ধরে চোখের ছানির অপারেশন করাতে পারছিলাম না। এক চোখে প্রায় দেখতামই না। আজ এখানে ডাক্তার দেখাতে পেরেছি এবং ফ্রিতে লেন্স লাগিয়ে দেওয়ার কথা বলেছে। আমাদের মতো গরিব মানুষের জন্য এই চিকিৎসা যেন আল্লাহর রহমত।” আমেনা বেগমের মতো আরও অনেক অসহায় রোগী ও তাদের স্বজনরা এই আয়োজন দেখে গভীর সন্তোষ প্রকাশ করেছেন এবং আয়োজকদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। বক্তারা সমাপনী বক্তব্যে বলেন, গ্রামীণ ও মফস্বল অঞ্চলের সাধারণ মানুষকে উন্নত চিকিৎসাসেবা দিতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি যদি বেসরকারি ও স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলো এভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে, তবে দেশের স্বাস্থ্যখাতে খুব দ্রুত একটি বড় ধরণের ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। বিশেষ করে চক্ষু রোগে আক্রান্ত প্রান্তিক মানুষের জন্য এই ধরণের বিনামূল্যে চিকিৎসা শিবির অন্ধত্ব দূরীকরণে অত্যন্ত কার্যকর ও টেকনিক্যাল ভূমিকা পালন করবে।