
নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রভাতী বাংলাদেশ
ঢাকা: রাজধানীর অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বাজার কারওয়ান বাজারে প্রতিদিন প্রায় দুই থেকে তিন কোটি টাকার বিপুল অঙ্কের চাঁদাবাজি হয় বলে বিস্ফোরক অভিযোগ করেছেন ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতা সাইফুল আলম খান মিলন। তিনি আরও দাবি করেন, এই বাজারের পাইকারি মুরগির দোকানগুলো থেকেই প্রতি মাসে প্রায় ৬০ লাখ টাকা চাঁদা তোলা হয়, যার চূড়ান্ত আর্থিক চাপ গিয়ে পড়ে সাধারণ ভোক্তাদের পকেটে। সোমবার (১৮ মে, ২০২৬) রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: political প্রতিশ্রুতি ও নাগরিক প্রত্যাশা’ শীর্ষক এক প্রাক-বাজেট সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠান চলাকালীন কারওয়ান বাজারের এই চাঁদাবাজি ইস্যু এবং এর দায় নিয়ে সংলাপে উপস্থিত জামায়াত ও বিএনপি এমপির মধ্যে তীব্র বাগ্বিতণ্ডা ও পাল্টাপাল্টি যুক্তি চলতে দেখা যায়। নিজের সংসদীয় এলাকা তেজগাঁও ও কারওয়ান বাজারের চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তুলে ধরে জামায়াত নেতা ও সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, “আমি তো আসলে চাঁদাবাজি এরিয়ার এমপি। আমাদের কারওয়ান বাজারে দৈনিক প্রায় দুই থেকে তিন কোটি টাকা কালেকশন বা চাঁদা তোলা হয়। কারওয়ান বাজারে কয়েকটা পাইকারি মুরগির দোকান আছে, স্রেফ তাদের কাছ থেকেই মাসে ৬০ লাখ টাকা চাঁদা নেওয়া হয়। কারওয়ান বাজারের চাঁদাবাজি নিয়ে বলতে গেলে পুরো একদিন সময় লেগে যাবে।
তিনি আরও অভিযোগ করে বলেন, এই চাঁদাবাজি যারা সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে, ওপরে তারা বড় বড় রাজনৈতিক নেতা সাজে, কিন্তু ভেতরে তারা মূলত চাঁদাবাজ। এটা আগের সরকারের লোকেরা করত, এখন ঠিক কারা করছে তা আর আমি এই প্রকাশ্য মঞ্চে বলছি না। জামায়াতের এই সংসদ সদস্যের বক্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিএনপির সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য মাহ্মুদা হাবীবা। তিনি এই বক্তব্যকে ঢালাও দাবি করে প্রত্যাখ্যান করেন। মাহ্মুদা হাবীবা বলেন, “মাননীয় এমপি সাহেব নিজে বলছেন তাঁর এলাকায় ভয়াবহ চাঁদাবাজি হচ্ছে, অথচ তিনি নাকি জানেন না কারা এগুলো করছেন। একজন জনপ্রতিনিধির মুখ থেকে এমন কথা শোনার চেয়ে দুঃখজনক আর কিছু হতে পারে না। কারা চাঁদাবাজি করছে তার একটা স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট তালিকা তাঁর (জামায়াতের এমপি) কাছে থাকা উচিত এবং সেই তালিকা নিয়ে তাঁর সরাসরি আইনের দ্বারস্থ হওয়া উচিত ছিল। তিনি আরও যোগ করেন, টকশোতে কিংবা গোলটেবিল বৈঠকে বসে আমরা এ ধরনের মুখরোচক আলোচনা করতেই পারি। কিন্তু যখন আমরা সুনির্দিষ্ট পাঁচটা নাম দিতে পারি না, সেটা তখন স্রেফ ঢালাও বক্তব্য হয়ে যায়। আমার সংসদীয় এলাকায় যারা চাঁদাবাজি করবে, সে সরকারি দল হোক বা বিরোধী দল—আমি তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করব এবং আইনের আশ্রয় নেব।
বিএনপি নেত্রীর এমন কড়া মন্তব্যের জবাবে জামায়াত এমপি সাইফুল আলম খান মিলন পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলেন, আগেও সরকারি দলের লোকেরাই চাঁদাবাজি করত, এখনো বর্তমান সরকারি দলের লোকেরাই চাঁদাবাজি করছে। আমার এলাকার সবচেয়ে বড় চাঁদাবাজির স্পট হলো এই কারওয়ান বাজার। আগে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে এই চাঁদাবাজিতে সরাসরি জড়িত ছিলেন। তিনি আমারই মহল্লার লোক, তাই আমি সব পরিষ্কার জানি। কারওয়ান বাজারের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কথা উল্লেখ করে মিলন বলেন, কারওয়ান বাজারে চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র করে কিছুদিন আগে যুবদলের একজন নেতা (মুসাব্বির) নিহত হয়েছিলেন। বিএনপির এমপি এখানে মামলা করার কথা সহজভাবে বলছেন; কিন্তু বাস্তবতা হলো, পুলিশ চাঁদাবাজি নিয়ে সরকারি দলের প্রভাবশালী লোকদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা নিতে চায় না। বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে মিলন জানান, “দেশের একজন মন্ত্রী আমাকে এই জটিল বিষয়টি নিয়ে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলাপ করার পরামর্শ দিয়েছেন। ইনশাআল্লাহ, আই উইল এনগেজ উইথ প্রাইম মিনিস্টার (আমি খুব দ্রুতই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলব)। আমি এই চাঁদাবাজি বন্ধে উনার সরাসরি হস্তক্ষেপ ও সাহায্য চাইব। আজকের এই প্রাক-বাজেট সংলাপে সঞ্চালকের ভূমিকা পালন করেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। সংলাপে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও বাজেট ভাবনা নিয়ে আরও বক্তব্য রাখেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক অধ্যাপক এ কে এনামুল হক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক শরমিন্দ নীলোর্মি এবং নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হকসহ দেশের বিশিষ্ট নাগরিক ও ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ।