
অপু দাস,ব্যুরো প্রধান, রাজশাহী
গ্রামীণ জনপদের বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে সেগুলোর কার্যকর সমাধানে গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের সমন্বিত ভূমিকা জোরদারের আহ্বান জানিয়ে রাজশাহীতে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় বক্তারা বলেন, সমাজের নানা সংকট সমাধানে শুধু সরকারি উদ্যোগই নয়, সাংবাদিক, সুশীল সমাজ, সামাজিক সংগঠন ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে।
রোববার (১২ জুলাই) সকাল সাড়ে ১০টায় রাজশাহী মহানগরীর একটি কনভেনশন সেন্টারে এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়।
সভাটি অনুষ্ঠিত হয় সুইস এজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কোঅপারেশন (এসডিসি), গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের আর্থিক সহায়তা ও ‘নাগরিকত্ব জিপিএ’-এর কারিগরি সহযোগিতায়। সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিল খান ফাউন্ডেশন এবং স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় ছিল সমতা নারী কল্যাণ সংস্থা ও লেডিস অর্গানাইজেশন ফর সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার (লফস)।
মতবিনিময় সভায় রাজশাহী জেলার চারটি উপজেলার সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন গণমাধ্যমে কর্মরত প্রায় ৪০ জন সাংবাদিক অংশগ্রহণ করেন। অংশগ্রহণকারীরা গ্রামীণ জনপদের সাধারণ মানুষের জীবনমান, সামাজিক সমস্যা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পরিবেশ ও আইনি সহায়তা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন।
আলোচনায় সমাজের চারটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা বিশেষভাবে উঠে আসে এবং সেগুলোর সমাধানে বিভিন্ন সুপারিশ প্রদান করা হয়।
প্রথমেই শিক্ষার্থীদের স্মার্টফোন আসক্তিকে বর্তমান সময়ের অন্যতম বড় সামাজিক সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বক্তারা বলেন, অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত স্মার্টফোন ব্যবহারের ফলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, মানসিক বিকাশ ও সামাজিক আচরণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ সমস্যা মোকাবিলায় পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ এবং গণমাধ্যমকে সমন্বিতভাবে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। পাশাপাশি অভিভাবকদের আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে সড়ক ও মহাসড়কের পাশে জীবন্ত গাছের গায়ে পেরেক পুঁতে ব্যানার, ফেস্টুন ও সাইনবোর্ড লাগানোর প্রবণতা বন্ধের দাবি জানানো হয়। বক্তারা বলেন, গাছের গায়ে পেরেক মারা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এবং এতে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। একই সঙ্গে এসব ব্যানার ও সাইনবোর্ড অনেক ক্ষেত্রে চালকদের দৃষ্টিসীমায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। তাই অবৈধভাবে স্থাপিত এসব সাইনবোর্ড দ্রুত অপসারণ এবং এ বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তৃতীয় আলোচ্য বিষয় ছিল গ্রামীণ এলাকার বিভিন্ন কমিউনিটি ক্লিনিকে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা গর্ভবতী নারীদের দুর্ভোগ। বক্তারা বলেন, অনেক ক্লিনিকে পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা না থাকায় গর্ভবতী নারীদের দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, যা তাদের জন্য কষ্টকর ও স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ। এ সমস্যা সমাধানে প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিকে পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
এছাড়া গ্রামের সাধারণ ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য বিনামূল্যে আইনি সহায়তা কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পায়। বক্তারা বলেন, অনেক মানুষ নিজেদের আইনগত অধিকার সম্পর্কে সচেতন নন কিংবা আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে আইনি সহায়তা নিতে পারেন না। তাই মাঠপর্যায়ে আইনি সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিনামূল্যে আইনি সহায়তা কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করার সুপারিশ করা হয়।
বক্তারা আরও বলেন, গ্রামীণ জনপদের বাস্তব সমস্যাগুলো গণমাধ্যমের মাধ্যমে নীতি-নির্ধারকদের সামনে তুলে ধরা হলে সেগুলোর সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ সহজ হবে। একই সঙ্গে সুশীল সমাজ মাঠপর্যায়ে জনগণকে সম্পৃক্ত করে সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের মধ্যে আরও নিবিড় সমন্বয় ও সহযোগিতা সময়ের দাবি।
‘লফস’-এর নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক মহিলা কমিশনার মোসাঃ শাহানাজ পারভীন লাকীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভাটি সঞ্চালনা করেন খান ফাউন্ডেশন রাজশাহীর জেলা প্রকল্প কর্মকর্তা মোঃ সাইফুল ইসলাম।
সভায় বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রায় ৪০ জন সংবাদকর্মী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তারা ভবিষ্যতেও এ ধরনের মতবিনিময় সভার ধারাবাহিক আয়োজনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন, যাতে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সমস্যা আরও কার্যকরভাবে চিহ্নিত ও সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া যায়।