
স্টাফ রিপোর্টার, রংপুর |
রংপুর: উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রধান চিকিৎসালয় রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও এক নিষ্পাপ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শনিবার (১৬ মে, ২০২৬) দিবাগত রাতে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের বিশেষায়িত আইসোলেশন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। রোববার (১৭ মে, ২০২৬) দুপুরে গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. আ ন ম তানভীর চৌধুরী নোমান। এই নতুন মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে রংপুর বিভাগজুড়ে হামের উপসর্গে মৃত শিশুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচজনে। একের পর এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় সাধারণ মানুষের মনে তীব্র আতঙ্ক দেখা দিয়েছে এবং চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। হাসপাতাল ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া ওই শিশুটির নাম মনি আক্তার। তার বয়স হয়েছিল মাত্র ৯ মাস। সে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার বাসিন্দা মাহাবুব আলমের মেয়ে। মাত্র ৯ মাস বয়সেই হামের মতো সংক্রামক ব্যাধির মরণকামড়ে নিভে গেল শিশুটির জীবন প্রদীপ। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে পরিবারটিতে এখন চলছে শোকের মাতম।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. আ ন ম তানভীর চৌধুরী নোমান জানান, “ঠাকুরগাঁও থেকে আসা শিশুটি যখন হাসপাতালে ভর্তি হয়, তখন থেকেই তার অবস্থা বেশ আশঙ্কাজনক ছিল। শিশুটি তীব্র জ্বর, সারা শরীরে লালচে ফুসকুড়ি বা র্যাশ এবং মারাত্মক শ্বাসকষ্টসহ হামের ক্লাসিক্যাল সব উপসর্গে ভুগছিল। আমরা তাকে চাইল্ড ওয়ার্ডের আইসোলেশন ইউনিটে রেখে বিশেষ পর্যবেক্ষণে চিকিৎসা দিচ্ছিলাম। কিন্তু চিকিৎসকদের সমস্ত চেষ্টা ও সর্বোচ্চ সহযোগিতা সত্ত্বেও তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে এবং রাতে সে মারা যায়।” ডা. নোমান আরও জানান, শিশুদের ক্ষেত্রে হামের পাশাপাশি নিউমোনিয়া বা মারাত্মক শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। মনি আক্তারের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই ঘটেছিল। এদিকে শুধু রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালই নয়, পুরো রংপুর বিভাগজুড়েই হামের উপসর্গে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকায় এই রোগের প্রাদুর্ভাব হঠাৎ করেই বৃদ্ধি পেয়েছে। রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের নিয়মিত বুলেটিন ও নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগে নতুন করে আরও ২৩ জন হামের লক্ষণযুক্ত রোগী সরকারি হাসপাতালগুলোতে শনাক্ত ও ভর্তি হয়েছেন।
নতুন আক্রান্তদের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:
ঠাকুরগাঁও জেনারেল হাসপাতাল: গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ৫ জন।
দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল: নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন ৮ জন।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল: গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১০ জন হামের রোগী আইসোলেশন ওয়ার্ডে যুক্ত হয়েছেন।
রংপুর বিভাগের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল থেকে প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রোববার (১৭ মে) দুপুর পর্যন্ত মোট ৪৬ জন হামে আক্রান্ত বা হামের তীব্র উপসর্গযুক্ত শিশু ও রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সরকারি হাসপাতালগুলোর শিশু ওয়ার্ডে এমনিতেই সাধারণ রোগীর চাপ বেশি থাকে, তার ওপর হঠাৎ করে হামের রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় চিকিৎসকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। অনেক হাসপাতালে আইসোলেশন শয্যার অভাব দেখা দেওয়ায় সাধারণ রোগীদের সংক্রামক ব্যাধির ঝুঁকি এড়ানো কঠিন হয়ে পড়ছে। রংপুরের সিভিল সার্জন এবং বিভাগীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে এবং সংক্রামক রোগ। সাধারণত সময়মতো ইপিআই (EPI) কর্মসূচির আওতায় হাম-রুবেলার (MR) টিকা না দেওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে এই রোগের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন: ১. শিশুর শরীরে তীব্র জ্বর এবং লালচে দানা বা ফুসকুড়ি দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে নিতে হবে। ২. আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা বা আইসোলেশনে রাখতে হবে। ৩. চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ধরনের কবিরাজি বা টোটকা চিকিৎসা দেওয়া যাবে না, যা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলতে পারে। ৪. যেসব শিশু এখনও হামের টিকা পায়নি, তাদের দ্রুত টিকাদান কেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে টিকা নিশ্চিত করতে হবে। রংপুর বিভাগের মফস্বল এলাকাগুলোতে স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে বিশেষ সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন এবং টিকাদান জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল, যাতে এই মহামারি রূপ নেওয়া সংক্রামক ব্যাধিকে দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়।