
ঢাকার ধামরাইয়ে পরিবেশগত কোনো বৈধ ছাড়পত্র বা নথিপত্র না থাকা এবং অবৈধভাবে কারখানা পরিচালনা করে মারাত্মক পরিবেশ দূষণ ঘটানোর দায়ে ‘জিয়াংশু স্টোরেজ ব্যাটারি (বিডি) কোম্পানি লিমিটেড’ নামের একটি ব্যাটারি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানকে ১ লক্ষ টাকা আর্থিক জরিমানা করেছে ধামরাই উপজেলা প্রশাসন। একই সাথে কারখানাটির অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ ও পরিবেশ সুরক্ষায় কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ধামরাই উপজেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ আল মামুনের নেতৃত্বে এই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। এই অভিযানের ফলে স্থানীয় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে।
স্থানীয় সূত্র ও প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার ধামরাই উপজেলার একটি আবাসিক ও কৃষিপ্রধান এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে গড়ে উঠেছিল এই ‘জিয়াংশু স্টোরেজ ব্যাটারি (বিডি) কোম্পানি লিমিটেড’। একটি ব্যাটারি কারখানা পরিচালনার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের যেসকল বাধ্যতামূলক ছাড়পত্র ও লাইসেন্সের প্রয়োজন হয়, তার কোনো কিছুই এই কারখানার ছিল না। সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে এবং স্থানীয় নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে কারখানা কর্তৃপক্ষ তাদের বাণিজ্যিক উৎপাদন চালিয়ে আসছিল। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ধামরাই উপজেলা প্রশাসন এই অবৈধ ব্যাটারি কারখানার খোঁজ পায় এবং তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
ধামরাই উপজেলা প্রশাসনের দূরদর্শী ও কঠোর পদক্ষেপের অংশ হিসেবে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ আল মামুন কারখানটিতে ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযানকালে কারখানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো বৈধ ছাড়পত্র বা হালনাগাদ কাগজপত্র প্রদর্শন করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন। এছাড়াও ব্যাটারি তৈরির মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে পরিবেশ সুরক্ষার কোনো বৈজ্ঞানিক ইটিপি (Effluent Treatment Plant) বা আধুনিক বর্জ্য শোধন ব্যবস্থা সেখানে পাওয়া যায়নি।
আইন অমান্য করে এবং পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি সাধন করার অপরাধে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ‘জিয়াংশু স্টোরেজ ব্যাটারি (বিডি) কোম্পানি লিমিটেড’-কে নগদ ১ লক্ষ টাকা আর্থিক জরিমানা অনাদায়ে কঠোর শাস্তির আদেশ দেন। কারখানা কর্তৃপক্ষ তাদের অপরাধ স্বীকার করে তাৎক্ষণিকভাবে জরিমানার টাকা পরিশোধ করতে বাধ্য হয় এবং ভবিষ্যতে ছাড়পত্র ছাড়া কোনো কার্যক্রম চালাবে না বলে মুচলেকা দেয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এই জিয়াংশু স্টোরেজ ব্যাটারি কারখানার কারণে ধামরাইয়ের বিস্তীর্ণ এলাকার পরিবেশ ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চরম হুমকির মুখে পড়েছে। ব্যাটারি তৈরির প্রধান কাঁচামাল সিসা ও ক্ষতিকর এসিডের বিষাক্ত ধোঁয়া এবং তরল বর্জ্য কোনো প্রকার শোধন ছাড়াই সরাসরি আশেপাশের খোলা জমি ও জলাশয়ে নিষ্কাশন করা হতো। এর ফলে কারখানার আশেপাশের এলাকার বাতাস সব সময় ভারী ও দুর্গন্ধময় হয়ে থাকত। স্থানীয় বাতাস বিষাক্ত হয়ে ওঠায় শিশু ও বৃদ্ধরা প্রতিনিয়ত শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগ এবং ফুসফুসের নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছিলেন। শুধু তাই নয়, বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্য মাটিতে মেশার কারণে আশেপাশের ফসলি জমির উর্বরতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পাচ্ছিল এবং ফলমূল ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছিল। এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এই বিষাক্ত পরিবেশ দূষণের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করে আসছিলেন।
অভিযান শেষে ধামরাই উপজেলা প্রশাসনের নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ আল মামুন গণমাধ্যমকে বলেন, “পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য ধ্বংস করে কোনো ধরনের অবৈধ ব্যবসা বা কারখানা ধামরাইয়ের মাটিতে চলতে দেওয়া হবে না। জিয়াংশু স্টোরেজ ব্যাটারি কোম্পানির কোনো পরিবেশগত ছাড়পত্র ছিল না এবং তারা মারাত্মকভাবে পরিবেশ দূষণ করে আসছিল। প্রাথমিক সতর্কবার্তা হিসেবে তাদের ১ লক্ষ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। যদি তারা দ্রুততম সময়ের মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র সংগ্রহ না করে এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত না করে, তবে আগামীতে কারখানাটি সম্পূর্ণভাবে সিলগালা ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, ধামরাই এলাকাকে দূষণমুক্ত রাখতে এবং সাধারণ মানুষের সুস্থ জীবনযাত্রা নিশ্চিত করতে পরিবেশ ধ্বংসকারী যেকোনো অবৈধ কলকারখানার বিরুদ্ধে ধামরাই উপজেলা প্রশাসনের এই বিশেষ অভিযান ও কঠোর নজরদারি নিয়মিত অব্যাহত থাকবে। এই ব্যাপারে কোনো প্রকার আপস করা হবে না।