
দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলায় গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে এক অনন্য ও প্রশংসনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। সরকারি বরাদ্দের আশায় হাত গুটিয়ে বসে না থেকে, সম্পূর্ণ ব্যক্তিমালিকানাধীন উদ্যোগ ও নিজস্ব অর্থায়নে শুরু হয়েছে দুই গ্রামের সংযোগকারী একটি জনগুরুত্বপূর্ণ কাঁচা রাস্তা নির্মাণের কাজ। উপজেলার ৭ নম্বর আউলিযাপুকুর ইউনিয়নের বোডপাড়া ও বড় গ্রামের মধ্যবর্তী এই রাস্তাটির নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ায় দুই এলাকার হাজারো মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের নিত্যদিনের যাতায়াতের চরম ভোগান্তি দূর করতে এলাকাবাসীর আন্তরিক সহযোগিতায় সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে এই মহতী ও মানবিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন এলাকার দুই কৃতি সন্তান মোহাম্মদ হামিদুল ইসলাম এবং মোহাম্মদ ফারুক। তাঁদের এই দৃষ্টান্তমূলক উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন স্থানীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ।
স্থানীয় ভুক্তভোগী বাসিন্দা ও এলাকা সূত্রে জানা গেছে, চিরিরবন্দর উপজেলার বোডপাড়া ও বড় গ্রাম—এই দুটি অত্যন্ত জনবহুল গ্রাম পাশাপাশি অবস্থিত হলেও মাঝখানে কোনো সংযোগ সড়ক ছিল না। দুই গ্রামের মধ্যে সরাসরি মাত্র এক কিলোমিটারের একটি রাস্তার সংযোগ না থাকায় দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে দুই তীরের বাসিন্দাদের চরম খেসারত দিতে হচ্ছিল। সামান্য দূরত্বের এই পথ পাড়ি দিতে এবং দৈনন্দিন জরুরি প্রয়োজনে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যাতায়াতের জন্য এলাকার মানুষদের দীর্ঘ ৫ থেকে ৬ কিলোমিটার রাস্তা ঘুরে বিকল্প পথে যাতায়াত করতে হতো।
রাস্তার এই চরম বেহাল দশা এবং সরাসরি যোগাযোগের অভাবের কারণে বিশেষ করে স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসাগামী কোমলমতি শিক্ষার্থী, উৎপাদিত ফসল বাজারে নেওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং মুমূর্ষু রোগীদের হাসপাতালে নেওয়ার সময় চরম ও অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছিল। বর্ষাকালে এই সমস্যা আরও কয়েক গুণ প্রকট আকার ধারণ করত। কাদা-পানিতে একাকার হয়ে দুই গ্রামের মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা একপ্রকার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ত।
দীর্ঘদিনের এই পুঞ্জীভূত জনদুর্ভোগ নিজের চোখে দেখে আর স্থির থাকতে পারেননি স্থানীয় সমাজসেবক মোহাম্মদ হামিদুল ইসলাম ও মোহাম্মদ ফারুক। তাঁরা উপলব্ধি করেন যে, কেবল সরকারি অনুদান বা ইউনিয়ন পরিষদের বাজেটের অপেক্ষায় থাকলে এই জনদুর্ভোগ আরও দীর্ঘায়িত হবে। তাই তাঁরা দুজনে মিলে সিদ্ধান্ত নেন এলাকাবাসীকে সাথে নিয়ে নিজেদের পকেটের টাকা খরচ করে এই রাস্তাটি নির্মাণ করবেন।
তাঁদের এই যুগান্তকারী ও সাহসী সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে জমি দেওয়া থেকে শুরু করে শারীরিক ও মানসিক শ্রম দিয়ে এগিয়ে আসেন বোডপাড়া ও বড় গ্রামের আপামর জনসাধারণ। সকলের সম্মিলিত সহযোগিতায় এবং এই দুই তরুণের সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে এক্সকাভেটর (ভেকু) গাড়ি এবং শ্রমিক লাগিয়ে মাটি কাটার কাজ পুরোদমে শুরু হয়েছে। এক কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই নতুন সংযোগ সড়কটি দৃশ্যমান হতে শুরু করায় দুই গ্রামের মানুষের মাঝে বইছে আনন্দের জোয়ার।
উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, রাস্তা নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হলে দুই গ্রামের মানুষের পারস্পরিক যাতায়াত ও সামাজিক বন্ধন এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। ৫-৬ কিলোমিটারের দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর পথ এখন মাত্র কয়েক মিনিটে এবং মাত্র এক কিলোমিটারের পথ ধরে অনায়াসে পার হওয়া যাবে। এর ফলে এলাকার মানুষের যাতায়াত যেমন সহজ ও আরামদায়ক হবে, তেমনি যাতায়াত খরচ এবং মূল্যবান সময় উভয়ই অর্ধেক বা তার চেয়েও বেশি কমে আসবে।
সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন এলাকার কৃষকেরা। চিরিরবন্দরের এই অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে কৃষিজাত পণ্য উৎপাদিত হয়। সরাসরি রাস্তা না থাকায় কৃষকেরা তাঁদের উৎপাদিত ধান, আলু, শাকসবজি সহজে বাজারে নিতে পারতেন না, ফলে পরিবহনের অতিরিক্ত খরচের কারণে ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হতেন। এই নতুন রাস্তাটি চালু হলে কৃষকেরা মাঠ থেকে সরাসরি ভ্যান বা ট্রলি দিয়ে ফসল দ্রুত বাজারে নিয়ে বিক্রি করতে পারবেন, যা তাঁদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলবে।
এই মহতী উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বোডপাড়া ও বড় গ্রামের একাধিক প্রবীণ বাসিন্দা অত্যন্ত আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “আমরা বাপদাদার আমল থেকে দেখে আসছি এই দুটি গ্রামের মানুষকে সামান্য কাজের জন্য মাইলের পর মাইল ঘুরে যেতে হতো। আজ আমাদের এলাকার ছেলেরা যে কাজ নিজ দায়িত্বে নিজের টাকা দিয়ে করে দিচ্ছে, তা সত্যিই অবিশ্বাস্য। আমরা তাদের জন্য মন থেকে দোয়া করি।”
পাশাপাশি তারা এই নবনির্মিত মাটির রাস্তার টেকসই উন্নয়নের জন্য স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (LGED) এবং সংশ্লিষ্ট চিরিরবন্দর উপজেলা প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। স্থানীয়দের মতে, বর্তমানে কাঁচা রাস্তা হিসেবে এটি নির্মাণ করা হলেও, ভবিষ্যতে যেন দ্রুত সময়ের মধ্যে এটিকে পাকা বা হেরিংবোন বন্ড (HBB) করণের মাধ্যমে একটি স্থায়ী টেকসই সড়কে রূপান্তর করা হয়। এই রাস্তাটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে দুই গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের পাশাপাশি এলাকার সার্বিক আর্থ-সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে এক অভাবনীয় ও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করছেন সচেতন মহল।