
নিজস্ব প্রতিবেদক
ফল, ভোজ্যতেল, ডিমসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো এবং সরকার নির্ধারিত মূল্যে এলপি গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি নিশ্চিত করতে দেশব্যাপী বিশেষ তদারকি অভিযান পরিচালনা করেছে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের ৩০ জেলায় একযোগে পরিচালিত এ অভিযানে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে ১০২টি প্রতিষ্ঠানকে মোট ১০ লাখ ৩১ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
রোববার (৪ অক্টোবর) জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ৪৪টি দল একযোগে বিভিন্ন পাইকারি ও খুচরা বাজার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং এলপি গ্যাসের ডিলার পয়েন্টে এ অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানের সময় ব্যবসায়ীদের পণ্যের মূল্যতালিকা প্রদর্শন, ক্রয়-বিক্রয়ের ভাউচার সংরক্ষণ ও ক্রেতাকে ভাউচার প্রদান, সঠিক ওজন ও পরিমাপ নিশ্চিত করা এবং সরকার নির্ধারিত মূল্যে এলপি গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে কি না—এসব বিষয় বিশেষভাবে যাচাই করা হয়।
মূল্যতালিকা ও ভাউচার যাচাই
জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের স্বাভাবিক সরবরাহ বজায় রাখা, অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি রোধ, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি বন্ধ এবং ভোক্তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করাই এ বিশেষ তদারকি কার্যক্রমের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
অভিযান পরিচালনাকালে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে দৃশ্যমান স্থানে হালনাগাদ মূল্যতালিকা প্রদর্শন করা হচ্ছে কি না তা দেখা হয়। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীরা পণ্য কেনার সময় যথাযথ ক্রয় ভাউচার সংগ্রহ করছেন এবং বিক্রির সময় ক্রেতাকে বিক্রয় ভাউচার দিচ্ছেন কি না, তাও যাচাই করা হয়।
এ ছাড়া পণ্যের ওজন ও পরিমাপে কোনো ধরনের কারচুপি হচ্ছে কি না এবং নির্ধারিত মূল্যের অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হচ্ছে কি না—এসব বিষয়েও নজরদারি করা হয়।
সাভারে এলপি গ্যাস বিক্রিতে অনিয়ম, দুই প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা
দেশব্যাপী পরিচালিত অভিযানের অংশ হিসেবে ঢাকার সাভারের আমতলা ও কুটুরিয়া বাজারে দুটি এলপি গ্যাস ডিলার পয়েন্টে অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়।
ঢাকা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালকের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে হাজী আব্দুর রহমান এন্টারপ্রাইজকে ১০ হাজার টাকা এবং ইকবাল এন্টারপ্রাইজকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
অভিযান সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতিষ্ঠান দুটির বিরুদ্ধে যথাযথভাবে ক্রয়-বিক্রয়ের ভাউচার সংরক্ষণ না করা, প্রদর্শিত মূল্যতালিকার তুলনায় বেশি দামে এলপি গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি এবং বিশেষ পাইপ ব্যবহার করে গ্যাস স্থানান্তরের মাধ্যমে ওজনে কারচুপির অভিযোগ পাওয়া যায়।
অভিযানের সময় কারচুপিতে ব্যবহৃত বিশেষ পাইপসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সিল ও স্টিকার জব্দ করা হয়। এ ধরনের অনিয়মের মাধ্যমে ভোক্তাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে কি না, সে বিষয়েও তদারকি করা হয়।
কৃত্রিম সংকট ও অযৌক্তিক মজুদের বিরুদ্ধে সতর্কতা
তদারকি কার্যক্রমের সময় ব্যবসায়ীদের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, অযৌক্তিকভাবে পণ্য মজুদ এবং বাজারে পণ্য সরবরাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়।
ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হয়, বাজারে স্বাভাবিক সরবরাহ বজায় রাখতে হবে এবং কোনো ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পণ্যের দাম বাড়ানো যাবে না। একই সঙ্গে দোকান বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দৃশ্যমান স্থানে হালনাগাদ মূল্যতালিকা প্রদর্শন করতে হবে।
পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে সঠিক ওজন ও পরিমাপ নিশ্চিত করার পাশাপাশি ক্রেতার সঙ্গে স্বচ্ছ ও ন্যায্য বাণিজ্যিক আচরণ করার জন্যও ব্যবসায়ীদের সতর্ক করা হয়।
ফলের বাজারেও নজরদারি
অভিযানে ফলের বাজারেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ব্যবসায়ীদের ন্যায্য ও যৌক্তিক মূল্যে ফল বিক্রির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পচা বা নষ্ট ফল ভালো ফলের সঙ্গে মিশিয়ে বিক্রি না করার জন্য সতর্ক করা হয়।
ফল সংরক্ষণ ও বিক্রির ক্ষেত্রে ক্ষতিকর রাসায়নিক কিংবা অননুমোদিত কোনো পদার্থ ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। ভোক্তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে—এমন কোনো কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
ভোক্তাদের যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলেছে অধিদপ্তর
পণ্য কেনার আগে ভোক্তাদের কয়েকটি বিষয় যাচাই করার পরামর্শ দিয়েছে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।
বিশেষ করে—
– পণ্য কেনার আগে দোকানে প্রদর্শিত মূল্যতালিকা যাচাই করতে হবে।
– পণ্যের সঠিক ওজন ও পরিমাণ বুঝে নিতে হবে।
– প্যাকেটজাত পণ্যের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য বা এমআরপি দেখতে হবে।
– উৎপাদনের তারিখ ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ যাচাই করতে হবে।
– প্রয়োজন হলে পণ্য কেনার রশিদ বা ভাউচার সংগ্রহ করতে হবে।
– এলপি গ্যাস সিলিন্ডার কেনার সময় সিলিন্ডারের ওজন পরীক্ষা করতে হবে।
– সিল ঠিক আছে কি না এবং সিলিন্ডারে দৃশ্যমান কোনো ত্রুটি রয়েছে কি না তা দেখে নিতে হবে।
– গ্যাস সিলিন্ডার কেনার পর অবশ্যই রশিদ বা ভাউচার সংগ্রহ করতে হবে।
অনিয়ম দেখলে ১৬১২১ নম্বরে অভিযোগ
জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, কোনো ব্যবসায়ী নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দাম নিলে, ওজনে কারচুপি করলে, পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করলে কিংবা অন্য কোনোভাবে ভোক্তার সঙ্গে প্রতারণা করলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করা যেতে পারে।
ভোক্তাদের যেকোনো অনিয়ম বা প্রতারণার শিকার হলে অধিদপ্তরের হটলাইন ১৬১২১ নম্বরে অভিযোগ জানানোর জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
তদারকি কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে
বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, ভোক্তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা এবং এলপি গ্যাসসহ প্রয়োজনীয় পণ্য সরকার নির্ধারিত বা যৌক্তিক মূল্যে বিক্রি নিশ্চিত করতে এ ধরনের তদারকি অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাজারে নিয়মিত নজরদারি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হলে অতিরিক্ত মূল্য আদায়, ওজনে কারচুপি, কৃত্রিম সংকট এবং ভোক্তা হয়রানি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ভোক্তাদেরও সচেতন হয়ে পণ্য কেনা এবং অনিয়ম দেখলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।