
অপু দাস, রাজশাহী ব্যুরো
রাজশাহীর বাঘা উপজেলার জোতকাদিরপুরে গণপিটুনিতে মো. শিমুল (২৮) নিহতের ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় তদন্তে মূলহোতা হিসেবে চিহ্নিত মো. ইসলাম আলী (৩০)কে গ্রেপ্তার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)-৫। রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) রাত ১০টা ২০ মিনিটে রাজশাহী মহানগরীর বোয়ালিয়া থানাধীন সবজীপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।গ্রেপ্তার ইসলাম আলী বাঘা উপজেলার জোতকাদিরপুর গ্রামের মো. আফসার মন্ডলের ছেলে। র্যাবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শিমুল হত্যা মামলার তদন্তে তার ভূমিকার বিষয়ে তথ্য পাওয়ার পর তাকে গ্রেপ্তারে গোয়েন্দা তৎপরতা চালানো হয়। পরে তার অবস্থান শনাক্ত করে নগরীর সবজীপাড়ায় অভিযান পরিচালনা করা হয়।র্যাব-৫ জানিয়েছে, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং বিভিন্ন অপরাধে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে তাদের নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় বাঘার আলোচিত শিমুল হত্যা মামলার আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হয়।যেভাবে ঘটনার সূত্রপাতমামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, নিহত শিমুলের বাবা মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা (৫৭) একজন কৃষক। তার বাড়ি বাঘা উপজেলার জোতকাদিরপুর গ্রামে। গত ৬ সেপ্টেম্বর সারাদিন কৃষিকাজ শেষে রাতে বাড়িতে ফিরে খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েন তিনি।পরদিন ৭ সেপ্টেম্বর ভোর আনুমানিক সাড়ে ৪টার দিকে নামাজ পড়ার জন্য জোতকাদিরপুর মন্ডলপাড়া জামে মসজিদের দিকে যাওয়ার সময় স্থানীয় লোকজনের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, গ্রামের ইয়ারুলের বাড়ির সামনে তার ছেলে শিমুল ও মো. শমজানকে চোর সন্দেহে আটক করা হয়েছে।স্থানীয়দের কাছ থেকে তিনি আরও জানতে পারেন, আটক দুজনকে সেখানে কয়েকজন ব্যক্তি মারধর করছে। এজাহারে বলা হয়েছে, শিমুল এর আগে একাধিকবার চুরির ঘটনায় ধরা পড়েছিল এবং প্রতিবারই তার বাবা জরিমানা দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে আনতেন। ছেলের এসব কর্মকাণ্ডে বাবা বিরক্ত থাকায় ঘটনার সময় তিনি ঘটনাস্থলে যাননি।পরে সকালে মাঠে কাজ করতে যাওয়ার পথে তিনি জানতে পারেন, ৭ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ৩টার দিকে জোতকাদিরপুর গ্রামের ইয়ারুলের বাড়ির সামনে ২০ থেকে ২৫ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি শিমুল ও শমজানকে চোর সন্দেহে আটক করে গণপিটুনি দেয়।গণপিটুনিতে শিমুল গুরুতর আহত হয়ে পড়লে স্থানীয়রা তাকে এবং শমজানকে একটি ভ্যানে করে হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা করে শিমুলকে মৃত ঘোষণা করেন।শিমুলের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে ঘটনাটি বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। দেশব্যাপী আলোচনায় আসে বাঘার এই গণপিটুনির ঘটনা।হত্যা মামলা দায়ের ঘটনার পর নিহত শিমুলের বাবা মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা বাদী হয়ে বাঘা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করা হয়।বাদীর অভিযোগের ভিত্তিতে ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে বাঘা থানায় মামলা নম্বর-০৯ হিসেবে মামলাটি রুজু করা হয়। মামলায় পেনাল কোড ১৮৬০-এর ৩০২/৩৪ ধারা প্রয়োগ করা হয়েছে।মামলা হওয়ার পর থেকেই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে তদন্ত শুরু হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি র্যাব-৫-এর গোয়েন্দা দলও মামলাটির বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ শুরু করে।রাতের অভিযানে গ্রেপ্তার র্যাব-৫ রাজশাহীর সদর কোম্পানির একটি বিশেষ আভিযানিক দল মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারে গোয়েন্দা নজরদারি চালিয়ে আসছিল। একপর্যায়ে তারা জানতে পারে, মামলার তদন্তে মূলহোতা হিসেবে চিহ্নিত ইসলাম আলী রাজশাহী মহানগরীর বোয়ালিয়া থানাধীন সবজীপাড়া এলাকায় আত্মগোপনে রয়েছেন।প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে রোববার রাত ১০টা ২০ মিনিটে সবজীপাড়ার জনৈক লাবনী বেগমের ভাড়া বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। এ সময় সেখান থেকে মো. ইসলাম আলীকে গ্রেপ্তার করে র্যাবের আভিযানিক দল।র্যাবের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ইসলাম আলী গ্রেপ্তার এড়ানোর উদ্দেশ্যে আত্মগোপনে থাকার কথা স্বীকার করেছেন।গ্রেপ্তার ইসলাম আলীকে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য রাজশাহী জেলার বাঘা থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানিয়েছে র্যাব-৫।এদিকে শিমুল হত্যা মামলায় জড়িত অন্য আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে তদন্ত ও আইনগত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।