
প্রভাতী বাংলাদেশ ডেস্ক:
বিবাহবিচ্ছেদের পর সাবেক স্বামী-স্ত্রী কি আবার একে অপরকে বিয়ে করতে পারেন? স্ত্রী নিজে স্বামীকে ‘ডিভোর্স লেটার’ পাঠালে তা কি শরিয়াহসম্মত তালাক হিসেবে গণ্য হয়? আবার দ্বিতীয় কোনো পুরুষকে বিয়ে করার পর প্রথম স্বামীর কাছে ফিরে আসতে চাইলে কী শর্ত পূরণ করতে হবে—এ ধরনের প্রশ্ন নিয়ে অনেকের মধ্যেই বিভ্রান্তি রয়েছে।
সম্প্রতি এমনই একটি ঘটনা সামনে এসেছে। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে একজন মাওলানা ফতোয়া দিয়েছেন, তওবা করার পর ওই নারীকে তার পূর্বের স্বামীর সঙ্গে পুনরায় বিয়ে দেওয়া যাবে। তবে এ ক্ষেত্রে শরিয়াহর সঠিক বিধান নির্ভর করবে প্রথমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তালাক কীভাবে সংঘটিত হয়েছিল এবং পরবর্তী বিবাহগুলো শরিয়াহসম্মতভাবে হয়েছিল কি না—তার ওপর।
ঘটনাটি কী?
জানা যায়, একটি পরিবারের ওই নারী বিবাহিত এবং তার দুই সন্তান রয়েছে। তাদের একজনের বয়স ১৩ বছর এবং অন্যজনের বয়স ৩ বছর।
একপর্যায়ে ওই নারী তার স্বামীকে রেখে অন্য এক যুবকের সঙ্গে চলে যান। পরে তিনি তার স্বামীর কাছে একটি ডিভোর্স লেটার পাঠান। বিষয়টি জানতে পেরে পরিবারের সদস্যরা তাকে ওই যুবকের কাছ থেকে ফিরিয়ে বাড়িতে নিয়ে আসেন।
এরপর পরিবারের পক্ষ থেকে ওই নারীকে তার পূর্বের স্বামীর সঙ্গে পুনরায় বিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু কিছুদিন পর ওই নারী আবারও ওই যুবকের সঙ্গে চলে যান এবং তাকে বিয়ে করেন বলে জানা যায়।
পরবর্তীতে তিনি আবার পরিবারের কাছে ফিরে আসেন। ফিরে এসে ওই নারী দাবি করেন, দ্বিতীয় ব্যক্তির সঙ্গে তার বিয়ে হলেও তাদের মধ্যে কোনো শারীরিক সম্পর্ক হয়নি।
এ অবস্থায় স্থানীয় একজন মাওলানা মত দেন, ওই নারী তওবা করলে তাকে পূর্বের স্বামীর সঙ্গে পুনরায় বিয়ে দেওয়া যাবে। তার পরামর্শ অনুযায়ী নতুন করে দেনমোহর নির্ধারণ করে ওই নারীকে পূর্বের স্বামীর সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়।
এখন প্রশ্ন হলো—এভাবে প্রথম স্বামীর সঙ্গে পুনরায় বিয়ে দেওয়া শরিয়াহসম্মত হয়েছে কি না?
ফতোয়া বিভাগের বক্তব্য
ঢাকার মোহাম্মদপুরের জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়ার ফতোয়া বিভাগের নায়েবে মুফতি তাওহীদুল ইসলামের বক্তব্য অনুযায়ী, এ ধরনের মাসআলার সঠিক হুকুম নির্ধারণ করতে প্রথমেই দেখতে হবে—ওই নারী যে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়েছিলেন, সেটির মাধ্যমে শরিয়াহসম্মতভাবে তালাক সংঘটিত হয়েছিল কি না।
এ ক্ষেত্রে কাবিননামার ১৮ নম্বর ঘর বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের ক্ষমতা বা অধিকার দেওয়া হয়েছিল কি না এবং দেওয়া হলে কত তালাকের অধিকার দেওয়া হয়েছিল—তা যাচাই করতে হবে।
কাবিননামায় তালাকের ক্ষমতা না থাকলে
যদি কাবিননামায় স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের অধিকার দেওয়া না থাকে, তাহলে শুধু স্ত্রী নিজের পক্ষ থেকে একটি ডিভোর্স লেটার পাঠালেই শরিয়াহ অনুযায়ী তালাক সংঘটিত হবে না—উল্লিখিত ফতোয়ার ব্যাখ্যা অনুযায়ী।
সেক্ষেত্রে প্রথম স্বামীর সঙ্গে তার বৈবাহিক সম্পর্ক বহাল থাকবে। অর্থাৎ স্ত্রী নিজে ডিভোর্স লেটার পাঠানোর কারণে স্বামীর সঙ্গে তার বৈবাহিক সম্পর্ক শেষ হয়ে গেছে—এমনটি ধরে নেওয়া যাবে না।
এ অবস্থায় ওই নারী অন্য কোনো পুরুষকে বিয়ে করলে সেই দ্বিতীয় বিবাহও শরিয়াহসম্মত হবে না বলে ফতোয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে।
আর যদি প্রথম স্বামীর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কই বহাল থাকে, তাহলে প্রথম স্বামীর কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য নতুন করে বিয়ের প্রয়োজন হবে না; কারণ সে মূলত প্রথম স্বামীর বিবাহবন্ধন থেকে বের হয়নি।
কাবিননামায় স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা দেওয়া থাকলে
অন্যদিকে, কাবিননামায় যদি স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের অধিকার দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি ভিন্ন হবে।
এ ক্ষেত্রে কতটি তালাক গ্রহণের অধিকার তাকে দেওয়া হয়েছিল, সেটি দেখতে হবে। স্ত্রী তার ওপর অর্পিত ক্ষমতার সীমার মধ্যেই তালাক গ্রহণ করতে পারবেন।
অর্থাৎ, তাকে যদি এক তালাক গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে তার বেশি তালাক গ্রহণ করার সুযোগ থাকবে না। একইভাবে দুই বা তিন তালাকের ক্ষমতা দেওয়া হয়ে থাকলে সে সেই সীমার মধ্যে তালাক গ্রহণ করতে পারবে।
তাই ওই নারীর পাঠানো ডিভোর্স লেটারে তিনি ঠিক কী উল্লেখ করেছিলেন এবং কাবিননামায় তাকে কতটুকু ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল—এসব নথি যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তালাকের পর দ্বিতীয় বিয়ে কখন বৈধ হবে?
ফতোয়ার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, স্ত্রী যদি শরিয়াহসম্মতভাবে প্রথম স্বামীর কাছ থেকে তালাকপ্রাপ্ত হয়ে থাকেন, তাহলে প্রথম স্বামীর তালাকের পর তার ইদ্দত পালন করতে হবে।
ইদ্দত শেষ হওয়ার আগে অন্য কোনো পুরুষকে বিয়ে করা যাবে না। ইদ্দত শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয় পুরুষকে বিয়ে করলে সেই বিয়ে শরিয়াহসম্মত হতে পারে।
কিন্তু প্রথম স্বামীর তালাকের ইদ্দত শেষ হওয়ার আগেই দ্বিতীয় পুরুষকে বিয়ে করলে সেই বিয়ে সহীহ হবে না—উল্লিখিত ফতোয়া অনুযায়ী।
দ্বিতীয় স্বামীকে বিয়ে করার পর প্রথম স্বামীর কাছে ফিরতে চাইলে
কোনো নারী প্রথম স্বামীর কাছ থেকে বৈধভাবে তালাকপ্রাপ্ত হয়ে ইদ্দত শেষ করার পর দ্বিতীয় পুরুষকে বিয়ে করলে এবং পরবর্তীতে প্রথম স্বামীর কাছে ফিরে যেতে চাইলে বিষয়টি আবার নতুন করে বিবেচনা করতে হবে।
দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর ওই নারীকেও দ্বিতীয় স্বামীর বিচ্ছেদের ইদ্দত পালন করতে হবে।
এরপর প্রথম স্বামীর পক্ষ থেকে তিন তালাক না হয়ে থাকলে, উভয়ের সম্মতিতে নতুন দেনমোহর নির্ধারণ করে নতুন করে বিবাহ করা যেতে পারে—উল্লিখিত ফতোয়ায় এমনটাই বলা হয়েছে।
তিন তালাকের ক্ষেত্রে বিধান আলাদা
তবে যদি প্রথম স্বামী স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়ে থাকেন, তাহলে বিষয়টি সাধারণভাবে সাবেক স্বামীর সঙ্গে নতুন করে বিয়ের মতো নয়। এ ক্ষেত্রে শরিয়াহর বিশেষ বিধান প্রযোজ্য হয়।
তাই কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের উচিত নয় শুধু স্থানীয়ভাবে কারও মুখে শোনা কথার ওপর ভিত্তি করে এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া।
স্ত্রীকে দেওয়া তালাকের ক্ষমতার সীমা
ফতোয়ায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, স্ত্রীকে যতটি তালাক গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তিনি সর্বোচ্চ ততটিই নিজের ওপর গ্রহণ করতে পারবেন।
উদাহরণ হিসেবে, স্ত্রীকে যদি তিন তালাক গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে তিনি চাইলে এক বা দুই তালাকও নিজের ওপর গ্রহণ করতে পারেন।
কিন্তু তাকে যদি এক বা দুই তালাক গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে তার চেয়ে বেশি তালাক গ্রহণের কথা ডিভোর্স লেটারে উল্লেখ করলেও অতিরিক্ত তালাক পতিত হবে না—উল্লিখিত ফতোয়ার ব্যাখ্যা অনুযায়ী।
এ ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কী?
উপরের ঘটনাটি থেকে স্পষ্ট যে, শুধু ‘ডিভোর্স লেটার’ পাঠানো হয়েছে কি না—এটিই চূড়ান্ত বিষয় নয়। বরং কয়েকটি বিষয় ধারাবাহিকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন—
১. প্রথম কাবিননামার ১৮ নম্বর ঘরে স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল কি না।
২. ক্ষমতা দেওয়া হলে কত তালাক গ্রহণের অধিকার দেওয়া হয়েছিল।
৩. ডিভোর্স লেটারে ওই নারী কী ধরনের তালাক গ্রহণের কথা উল্লেখ করেছিলেন।
৪. প্রথম তালাক বৈধভাবে সংঘটিত হয়ে থাকলে ইদ্দত শেষ হয়েছিল কি না।
৫. দ্বিতীয় ব্যক্তির সঙ্গে বিয়ের সময় প্রথম স্বামীর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক আদৌ শেষ হয়েছিল কি না।
৬. দ্বিতীয় বিয়ে শরিয়াহসম্মতভাবে সংঘটিত হয়েছিল কি না।
৭. দ্বিতীয় বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে থাকলে তার পর ইদ্দত পালন করা হয়েছিল কি না।
৮. প্রথম স্বামীর পক্ষ থেকে এর আগে কয়টি তালাক দেওয়া হয়েছিল।
এসব তথ্য ও কাগজপত্র যাচাই না করে শুধু ঘটনাটি শুনে ‘বিয়ে সহীহ হয়েছে’ বা ‘বিয়ে হয়নি’—এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক নয়।
শরিয়াহর দলিল
এ বিষয়ে ফিকহের বিভিন্ন গ্রন্থে তালাকের ক্ষমতা এবং তালাক সংঘটনের বিষয়ে আলোচনা রয়েছে। উল্লিখিত ফতোয়ার সঙ্গে মারকাতুল মাফাতীহ, কিতাবুন নিকাহ, বাবুত তালাক ওয়াল খুলা এবং ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া, কিতাবুত তালাকসহ অন্যান্য ফিকহের গ্রন্থের উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে।
ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়ায় তালাকের স্পষ্ট শব্দ এবং তালাক সংঘটনের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। একইভাবে ফাতাওয়ায়ে শামিতেও তালাকের বিভিন্ন বিধান ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
সাধারণ মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
বিয়ে, তালাক, ইদ্দত ও পুনর্বিবাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শরিয়াহভিত্তিক বিষয়। এ ধরনের ঘটনায় সামাজিকভাবে প্রচলিত ধারণা বা কারও মুখে শোনা বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
বিশেষ করে কাবিননামা, তালাকের নোটিশ বা ডিভোর্স লেটার, তালাকের তারিখ, ইদ্দতের সময় এবং দ্বিতীয় বিয়ের নথি—সবকিছু সামনে রেখে যোগ্য মুফতি বা সংশ্লিষ্ট ফতোয়া বিভাগের কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করা উচিত।
কারণ একই ধরনের দেখতে দুটি ঘটনায় কাগজপত্র ও তালাকের ধরন ভিন্ন হলে শরিয়াহর হুকুমও ভিন্ন হতে পারে।
সুতরাং, আলোচিত ঘটনার ক্ষেত্রে ওই নারীর প্রথম বিবাহের কাবিননামা, ১৮ নম্বর ঘরের তথ্য, ডিভোর্স লেটারের ভাষা, প্রথম তালাকের বৈধতা, দ্বিতীয় বিবাহ এবং উভয় বিবাহের মধ্যবর্তী ইদ্দতের বিষয়গুলো যাচাই না করে পুনর্বিবাহের বৈধতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া সমীচীন নয়।
ফিকহের উদ্ধৃতি:
মারকাতুল মাফাতীহ: কিতাবুন নিকাহ, বাবুত তালাক ওয়াল খুলা, ৫/২১৪৩, দারুল ফিকর।
ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া: কিতাবুত তালাক, ১/৩৫৪, রশিদিয়া।
ফাতাওয়ায়ে শামি: কিতাবুত তালাক, বাবু সরীহিত তালাক, ৩/২৪৮, সাঈদ।
নোট: এটি একটি শরিয়াহভিত্তিক ফতোয়া/ব্যাখ্যার সংবাদধর্মী উপস্থাপন। বাস্তব কোনো দাম্পত্য বিরোধ বা পুনর্বিবাহের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কাবিননামা ও অন্যান্য নথিপত্র নিয়ে যোগ্য মুফতির কাছ থেকে ব্যক্তিগতভাবে ফতোয়া গ্রহণ করা উচিত।