
মোঃ শরীফ উদ্দিন মোল্লা, লালমনিরহাট।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের পর এবার জনস্বাস্থ্যে উচ্চশিক্ষা; লালমনিরহাটের তরুণ চিকিৎসকের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন যাত্রা, লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার প্রত্যন্ত সিন্দুর্না ইউনিয়নের মাটি থেকে উঠে এসে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পথ পেরিয়ে এবার যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বখ্যাত জন হপকিন্স ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন বাংলাদেশি চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ সাইয়েদুল আরেফিন সৈকত।
জন হপকিন্স ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথের মাস্টার অব পাবলিক হেলথ (এমপিএইচ) প্রোগ্রামের ফেব্রুয়ারি ২০২৭ সেশনের জন্য চূড়ান্তভাবে মনোনীত হয়েছেন তিনি। দীর্ঘ যাচাই-বাছাইয়ের পর তাঁর একাডেমিক পারফরম্যান্স, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা এবং জনস্বাস্থ্য খাতে কাজের প্রতি অঙ্গীকার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে বিবেচনায় নিয়ে তাঁকে এ সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
সিন্দুর্নার প্রত্যন্ত জনপদ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছানোর এই অর্জনকে শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য হিসেবে দেখছেন না স্থানীয়রা। তাঁদের মতে, ডা. সৈকতের এই অর্জন লালমনিরহাটের হাতীবান্ধাসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থী ও তরুণদের জন্য বড় ধরনের অনুপ্রেরণার উদাহরণ।
ডা. মোহাম্মদ সাইয়েদুল আরেফিন সৈকতের গ্রামের বাড়ি লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার সিন্দুর্না ইউনিয়নে। তাঁর বাবা শরিফুল ইসলাম সরকারি আলিমুদ্দিন কলেজের ফলিত রসায়ন বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী অধ্যাপক।
শৈশব থেকেই পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে এগিয়ে যান ডা. আরেফিন। স্থানীয় শিক্ষকদের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের উৎসাহ ও সহযোগিতা তাঁর শিক্ষাজীবনের পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তুরস্কের ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়-জেররাহপাশা ফ্যাকাল্টি অব মেডিসিন থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেন তিনি। চিকিৎসাশিক্ষা শেষ করার পর জরুরি চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য ও মানবিক চিকিৎসাসেবার সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন।
চিকিৎসা পেশাকে শুধু হাসপাতালের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষের বৃহত্তর স্বাস্থ্যঝুঁকি, দুর্যোগ ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন তিনি। মাঠপর্যায়ে অর্জিত সেই অভিজ্ঞতাই তাঁর ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবনের লক্ষ্যকে আরও সুদৃঢ় করে।
রোহিঙ্গা সংকটে কক্সবাজারে মানবিক চিকিৎসাসেবা
ডা. সাইয়েদুল আরেফিন সৈকতের পেশাগত জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় কেটেছে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটের সময়।
রোহিঙ্গা শরণার্থীদের স্বাস্থ্যসেবা ও জনস্বাস্থ্য কার্যক্রমে তিনি বেশ কিছুদিন কাজ করেন। তুরস্ক থেকে বাংলাদেশে আসা প্রথম প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
কক্সবাজারে প্রতিষ্ঠিত তুর্কি ফিল্ড হাসপাতালে ভিজিটিং ডাক্তার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ডা. আরেফিন। সেখানে বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, সীমিত সম্পদের মধ্যে চিকিৎসা দেওয়া, সংক্রামক রোগের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং মানবিক সংকটের নানা চ্যালেঞ্জের সঙ্গে সরাসরি কাজ করার সুযোগ হয় তাঁর।
এই মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা তাঁর চিকিৎসকসত্তাকে আরও বিস্তৃত করে। ব্যক্তিগত রোগীর চিকিৎসার পাশাপাশি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যঝুঁকি, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে চিকিৎসাসেবার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি।
বর্তমানে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে জরুরি বিভাগ ও পেশাগত স্বাস্থ্য চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত আছেন ডা. মোহাম্মদ সাইয়েদুল আরেফিন সৈকত।
পাশাপাশি তিনি যুক্তরাজ্যের রয়্যাল কলেজ অব ইমার্জেন্সি মেডিসিন (RCEM)-এর অ্যাফিলিয়েট সদস্য হিসেবে যুক্ত রয়েছেন।
চিকিৎসা, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা, মানবিক চিকিৎসা এবং জনস্বাস্থ্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্জিত অভিজ্ঞতাকে এবার আরও বৃহৎ পরিসরে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে তাঁর সামনে।
জন হপকিন্সে নতুন একাডেমিক যাত্রা বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় জনস্বাস্থ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জন হপকিন্স ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথে এমপিএইচ পড়ার সুযোগ ডা. আরেফিনের শিক্ষা ও পেশাগত জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য বিষয়ে উচ্চতর জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা, জরুরি চিকিৎসাসেবা ও জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার প্রত্যাশা করছেন তিনি।
বিশেষ করে মাঠপর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতা এবং একাডেমিক জ্ঞানকে সমন্বয় করে দেশের স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘমেয়াদি অবদান রাখার লক্ষ্য রয়েছে তাঁর।
আল্লাহর অশেষ রহমতে আমি অত্যন্ত আনন্দিত ও কৃতজ্ঞ নিজের এই অর্জনে আনন্দ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে ডা. মোহাম্মদ সাইয়েদুল আরেফিন সৈকত বলেন,
«“আল্লাহর অশেষ রহমতে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় একটি প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ পেয়ে আমি অত্যন্ত আনন্দিত ও কৃতজ্ঞ।”»
নিজের দীর্ঘ পথচলার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, লালমনিরহাটের প্রান্তিক এলাকা থেকে শুরু করে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের স্বাস্থ্যসেবায় কাজ এবং পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পৌঁছানোর এই যাত্রা ছিল অত্যন্ত পরিশ্রমের।
তাঁর মতে, এই পথচলায় পরিবারের সহযোগিতা, শিক্ষকদের দিকনির্দেশনা এবং বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের অনুপ্রেরণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
দেশের স্বাস্থ্য খাতে অবদান রাখাই মূল লক্ষ্য ভবিষ্যৎ লক্ষ্য সম্পর্কে ডা. আরেফিন বলেন, জনস্বাস্থ্য ও জরুরি চিকিৎসাসেবা বিষয়ে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান দিয়ে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি দেশের স্বাস্থ্য খাতের মানোন্নয়নে অবদান রাখাই আমার মূল লক্ষ্য।
তিনি মনে করেন, জনস্বাস্থ্য ও জরুরি চিকিৎসাসেবার সমন্বিত উন্নয়ন দেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সাফল্যের পেছনে পরিবারের পাশাপাশি শিক্ষকদের অবদান ডা. মোহাম্মদ সাইয়েদুল আরেফিন সৈকতের এই সাফল্যের পেছনে পরিবারের পাশাপাশি তাঁর শৈশবের গৃহশিক্ষক গোলজার হোসেন এবং মামা আনোয়ার হোসেন মিন্টুর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।
তাঁদের সহযোগিতা, উৎসাহ ও দিকনির্দেশনা ডা. আরেফিনের শিক্ষাজীবনের ভিত্তি গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ডা. আরেফিনের এই অর্জন সম্পর্কে তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষী ও স্থানীয়রা বলেন, প্রত্যন্ত এলাকা থেকে উঠে এসে মেধা, পরিশ্রম ও কর্মনিষ্ঠার মাধ্যমে জন হপকিন্সের মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাওয়া সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক।
তাঁদের মতে, তাঁর এই অর্জন শুধু তাঁর পরিবার বা সিন্দুর্না ইউনিয়নের জন্য নয়, হাতীবান্ধা, লালমনিরহাট তথা পুরো বাংলাদেশের জন্যই গর্বের বিষয়।
সিন্দুর্নার একটি প্রত্যন্ত জনপদ থেকে শুরু হওয়া ডা. মোহাম্মদ সাইয়েদুল আরেফিন সৈকতের এই পথচলা প্রমাণ করে—সুযোগ, মেধা, পরিশ্রম ও দৃঢ় প্রত্যয় থাকলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকেও বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানে পৌঁছানো সম্ভব।
জন হপকিন্সে তাঁর নতুন একাডেমিক যাত্রা ভবিষ্যতে দেশের স্বাস্থ্য খাত ও বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যে আরও বড় অবদান রাখার পথ তৈরি করবে—এমনটাই প্রত্যাশা তাঁর পরিবার, স্বজন, শিক্ষক ও এলাকাবাসীর।