শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০১:২৫ অপরাহ্ন
Title :
সুন্দরগঞ্জে মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ার আহ্বান সুবিপ্রবি ভিসির সঙ্গে সুনামগঞ্জ ও শান্তিগঞ্জের নেতৃবৃন্দের সাক্ষাৎ দীর্ঘ জীবনের জন্য নতুন ভাবনা শেরপুরে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসে র‍্যালি ও আলোচনা সভা তালায় ৩৬তম আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস পালিত ঠাকুরগাঁওয়ে ভ্যান চালকের বাড়িতে আগুন,পুড়ে ছাই প্রায় লাখ টাকার মালামাল। ফরিদপুরে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস পালিত, মর্যাদাপূর্ণ বার্ধক্য নিশ্চিতের আহ্বান সৈয়দপুর পৌরসভার ৯২ কোটি ৭৬ লক্ষ টাকার বাজেট ঘোষণা লুৎফুর রহমানের মায়ের মৃত্যুতে এমপি কয়ছর এম আহমেদের গভীর শোক প্রধানমন্ত্রীর ফেনী সফর উপলক্ষে চান্দিনায় বিএনপির নেতাকর্মীদের শুভেচ্ছা আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন ও সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষায় ঢাকা জেলা পুলিশ ও হিজড়া সম্প্রদায়ের যৌথ আলোচনা সভা

লারাবাঙ্গা মসজিদ পশ্চিম আফ্রিকার মক্কা’ খ্যাত এক অলৌকিক ও ঐতিহাসিক স্থাপনা

  • Update Time : সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬
  • ১৫৬ Time View

ইসলামের ইতিহাস ও ঐতিহ্য কেবল আরব উপদ্বীপের মরুঝড়ের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা বিশ্বের নানা প্রান্তে, নানা মহাদেশে ছড়িয়ে আছে মুসলিম সভ্যতার গৌরবময় অসংখ্য নিদর্শনের মাধ্যমে। এশিয়া থেকে ইউরোপ, কিংবা আফ্রিকার বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড—সবখানেই রয়েছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে থাকা ইসলামের আলো, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির জীবন্ত প্রতীক। আফ্রিকা মহাদেশের ‘গোল্ড কোস্ট’ নামে পরিচিত দেশ ঘানার সাভানা অঞ্চলের মুসলিমপ্রধান লারাবাঙ্গা গ্রামে এমনই এক অনন্য স্থাপনা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এর নাম ‘লারাবাঙ্গা মসজিদ’ (Larabanga Mosque)। ইতিহাস, লোককথা, গভীর ধর্মীয় বিশ্বাস এবং মাটি ও কাঠের ব্যতিক্রমী স্থাপত্যশৈলীর এক অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই মসজিদটি আজ বিশ্বজুড়ে ‘পশ্চিম আফ্রিকার মক্কা’ হিসেবে পরিচিত। এটি শুধু ঘানার সবচেয়ে প্রাচীন মসজিদই নয়, বরং সমগ্র পশ্চিম আফ্রিকার অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহাসিক ইসলামী স্থাপনার মর্যাদা লাভ করেছে। প্রতিবছর অসংখ্য পর্যটক, গবেষক, ইতিহাসবিদ ও ধর্মপ্রাণ মুসল্লি এই ঐতিহাসিক মসজিদটি দেখতে এবং এর আধ্যাত্মিক আবহ অনুভব করতে এখানে ছুটে আসেন।

লারাবাঙ্গা মসজিদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর নির্মাণশৈলী। এটি সম্পূর্ণ দেশীয় কাঁচামাল দিয়ে নির্মিত। কাদা-মাটি, বালি ও কাঠের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই মসজিদটি ‘সুদানীয়-সাহেলীয়’ (Sudano-Sahelian) স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য উদাহরণ। মসজিদের দেয়ালগুলো মাটির তৈরি হলেও এর ভেতরে কাঠের বিম বা কাঠামো ব্যবহার করা হয়েছে, যা মাটির দেয়ালকে শত শত বছর ধরে শক্ত করে ধরে রেখেছে। মসজিদের বাইরে রয়েছে বেশ কিছু ত্রিকোণাকার বা পিরামিড আকৃতির মিনার, যা দূর থেকে দেখতে অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন ও রহস্যময় লাগে। এই মিনারগুলোর মাথায় উটের ডিমের মতো সাদা গোলক বসানো রয়েছে, যা আফ্রিকার ঐতিহ্যবাহী মুসলিম স্থাপত্যের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। আফ্রিকার তীব্র গরমের মধ্যেও মসজিদের ভেতরের পরিবেশকে শীতল রাখতে এই বিশেষ কাদা-মাটির দেয়াল অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। লারাবাঙ্গা মসজিদের নির্মাণ ইতিহাসকে ঘিরে স্থানীয় মানুষ ও ইতিহাসবিদদের মাঝে নানা কিংবদন্তি, অলৌকিক ঘটনা ও মনমুগ্ধকর লোকগাথা প্রচলিত রয়েছে। ইতিহাস ও বিশ্বাসের এই মেলবন্ধন মসজিদটিকে আরও বেশি রহস্যময় ও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বহুল প্রচলিত জনশ্রুতি অনুযায়ী, ১৪২১ খ্রিষ্টাব্দে আইয়ুবা নামের এক আরব মুসলিম ব্যবসায়ী ও ধর্মপ্রচারক সাহারা মরুভূমি অতিক্রম করার সময় এই অঞ্চলের একটি রহস্যময় পাথরের পাশে রাতযাপন করেন। সেই রাতে তিনি স্বপ্নে এক ঐশ্বরিক নির্দেশ পান, যেখানে তাঁকে এই নির্দিষ্ট স্থানে একটি মসজিদ নির্মাণ করতে বলা হয়। বিস্ময়করভাবে, পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে তিনি দেখতে পান, মানুষের কোনো স্পর্শ ছাড়াই মসজিদের ভিত্তি বা চারপাশের দেয়ালের শুরুর অংশ অলৌকিকভাবে প্রস্তুত হয়ে আছে। একে আল্লাহর কুদরত ও ইশারা মনে করে তিনি সেই অলৌকিক ভিত্তির ওপর মসজিদের বাকি অংশ নির্মাণ করেন। লোকবিশ্বাস ও স্থানীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী, মৃত্যুর পর আইয়ুবাকে এই মসজিদের পাশেই অত্যন্ত মর্যাদার সাথে দাফন করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা দাবি করেন, তাঁর দাফনের ঠিক তিন দিন পর কবরের ওপর একটি বাওবাব (Baobab) গাছ জন্ম নেয়। শত শত বছর পার হয়ে গেলেও সেই বাওবাব গাছটি আজও মসজিদের পাশে একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে। স্থানীয়দের গভীর বিশ্বাস, এই গাছের পাতা, ছাল ও কাণ্ডে বিশেষ ঔষধি গুণ রয়েছে এবং বিভিন্ন কঠিন ও জটিল রোগের চিকিৎসায় অলৌকিক প্রতিষেধক হিসেবে এটি ব্যবহৃত হয়।

মসজিদের প্রতিষ্ঠা এবং লারাবাঙ্গা গ্রামের নামকরণ নিয়ে আরেকটি ঐতিহাসিক জনশ্রুতিও এলাকায় প্রচলিত রয়েছে। এই মতানুযায়ী, ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দের শেষদিকে ব্রাইমাহ নামের এক মুসলিম যোদ্ধা ও নেতা যুদ্ধ শেষে এই অঞ্চলে আসেন। তিনি একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তাঁর হাতের বল্লমটি শূন্যে নিক্ষেপ করেন এবং প্রতিজ্ঞা করেন, বল্লমটি যেখানে গিয়ে পড়বে, সেখানেই তিনি নিজের স্থায়ী বসতি স্থাপন করবেন। অলৌকিকভাবে বল্লমটি একটি উঁচু ও উজ্জ্বল স্থানে গিয়ে পতিত হয়, যা ছিল মূলত বর্তমান মসজিদের স্থান। পরবর্তীতে তিনি সেখানে নিজের পরিবার ও অনুসারীদের নিয়ে বসতি গড়ে তোলেন এবং এই ঐতিহাসিক মসজিদটি পুনর্নির্মাণ বা সংস্কার করেন। তিনি এই স্থানটির নাম দেন ‘লারাবাঙ্গা’, স্থানীয় ভাষায় যার অর্থ হলো—‘আরবদের ভূমি’ (The Land of Arabs)।

লারাবাঙ্গা মসজিদের ভেতরে শুধু স্থাপত্যশৈলীই নয়, বরং সেখানে সংরক্ষিত একটি অত্যন্ত প্রাচীন পবিত্র কুরআন মাজিদও বিশ্বজুড়ে মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। এই কুরআনকে ঘিরে রয়েছে এক অবিশ্বাস্য আধ্যাত্মিক ইতিহাস। স্থানীয়দের দৃঢ় বিশ্বাস, ১৬৫০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে তৎকালীন মসজিদের ইমাম ইদান বারিমাহ ব্রামাহ গভীর রাতে আল্লাহর দরবারে বিশেষ আকুতি ও মোনাজাত করেন। তাঁর এই গভীর ভক্তি ও প্রার্থনায় সন্তুষ্ট হয়ে মহান আল্লাহ তায়ালা জান্নাত থেকে উপহার হিসেবে এই পুণ্যময় কুরআন মাজিদটি তাঁর কাছে সরাসরি নাজিল বা প্রেরণ করেন। যদিও এটি সম্পূর্ণ স্থানীয় লোকবিশ্বাস ও ধর্মীয় অনুভূতির অংশ, তবুও এই কুরআনকে ঘিরে মানুষের মনে যে গভীর শ্রদ্ধা ও পবিত্র অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছে, তা আজও ম্লান হয়নি। বিশেষ বিশেষ ধর্মীয় উৎসবে বা সংকটের সময়ে এই কুরআনটি দেখার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসে।

শত শত বছরের পুরনো হওয়ায় এবং কাদা-মাটির তৈরি হওয়ার কারণে লারাবাঙ্গা মসজিদটি বিভিন্ন সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বৃষ্টির মুখে পড়েছে। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে একবার ভুল সংস্কারের কারণে এর মাটির দেয়ালের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। পরবর্তীতে ওয়ার্ল্ড মনুমেন্টস ফান্ড (World Monuments Fund) এই মসজিদটিকে বিশ্বের অন্যতম বিপন্ন ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। ২০০২ সালের দিকে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে এবং স্থানীয় প্রবীণদের সহায়তায় ঐতিহ্যবাহী সুদানীয়-সাহেলীয় পদ্ধতিতেই মসজিদটিকে পুনরায় সংস্কার করা হয়। বর্তমানে ঘানা সরকার এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা এই মসজিদের সুরক্ষায় কাজ করছে। লারাবাঙ্গা মসজিদ শুধু একটি ইটের বা মাটির উপাসনালয় নয়; এটি আফ্রিকায় ইসলামের দীর্ঘ গৌরবময় ঐতিহ্য, টিকে থাকার লড়াই এবং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের এক জীবন্ত ও জাগ্রত প্রতীক। ঘানার এই প্রত্যন্ত গ্রামে অবস্থিত মসজিদটি আজ প্রমাণ করে যে, ইসলাম কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমারেখায় আবদ্ধ নয়, বরং তা বিশ্বজনীন।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2019 Breaking News
Theme Customized By BreakingNews