
স্বাস্থ্য ডেস্ক:
ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আবহাওয়ার তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার পরিবর্তন ঘটে। এ সময় অনেকের মধ্যেই ঠান্ডা, সর্দি-কাশি, জ্বর, গলা ব্যথা ও বিভিন্ন ধরনের শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক কম, তাদের এ সময়ে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
শরীরকে সুস্থ রাখতে শুধু ওষুধের ওপর নির্ভর না করে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পুষ্টিকর খাবার, মৌসুমি ফল ও বিভিন্ন রঙের শাকসবজি রাখা জরুরি। বিশেষ করে ভিটামিন ‘সি’, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ফাইবার ও বিভিন্ন প্রয়োজনীয় ভিটামিন-খনিজসমৃদ্ধ ফল শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সহায়তা করতে পারে।
তবে মনে রাখতে হবে, কোনো একটি ফল সর্দি-কাশি বা সংক্রমণ পুরোপুরি প্রতিরোধ করতে পারে না। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত হাত ধোয়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
দেশীয় মৌসুমি ফল রাখুন খাদ্যতালিকায়
বাংলাদেশে প্রায় সারা বছরই বিভিন্ন ধরনের মৌসুমি ফল পাওয়া যায়। সহজলভ্য ও পুষ্টিকর এসব ফল নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে।
পেয়ারা, আমড়া, কামরাঙ্গা, বরই, বাউকুল, লেবু, কমলা, মালটা, আনার, নাশপাতি, ড্রাগন ফল ও আঙুর—এসব ফল পরিমিত পরিমাণে খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।
ফল খাওয়ার সময় সম্ভব হলে মৌসুমি ও তাজা ফল বেছে নেওয়া ভালো। ফল ভালোভাবে ধুয়ে খেতে হবে এবং অতিরিক্ত চিনি বা লবণ মিশিয়ে খাওয়ার অভ্যাস এড়িয়ে চলা উচিত।
পেয়ারা: ভিটামিন ‘সি’র ভালো উৎস
পেয়ারা বাংলাদেশের অত্যন্ত পরিচিত ও সহজলভ্য একটি ফল। স্বাদ ও পুষ্টিগুণের কারণে এটি খাদ্যতালিকায় নিয়মিত রাখা যেতে পারে। পেয়ারায় ভিটামিন ‘সি’, ফাইবার ও বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে।
ভিটামিন ‘সি’ শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে পেয়ারার ফাইবার হজমশক্তি ও অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
পেয়ারা সরাসরি ফল হিসেবে খাওয়ার পাশাপাশি সালাদ হিসেবেও খাওয়া যায়। শিশুদের ফল খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে পেয়ারাসহ বিভিন্ন ফল দিয়ে ঘরে তৈরি স্বাস্থ্যকর খাবার তৈরি করা যেতে পারে।
কমলা ও মালটা: শীত-ঋতুর জনপ্রিয় ফল
কমলা ও মালটা ভিটামিন ‘সি’র পরিচিত উৎস। এসব ফলে পানি ও বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্টও রয়েছে। নিয়মিত ফল খাওয়ার অভ্যাস সামগ্রিক স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে।
কমলা সরাসরি খাওয়া যায়। তবে বাজারজাত অতিরিক্ত চিনি যুক্ত ফলের জুসের পরিবর্তে তাজা ফল খাওয়াই ভালো, কারণ এতে প্রাকৃতিক ফাইবারও পাওয়া যায়।
লেবু: প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন
ভিটামিন ‘সি’র অন্যতম পরিচিত উৎস হলো লেবু। অল্প পরিমাণ লেবু খাবারের সঙ্গে যোগ করলে স্বাদ বাড়ার পাশাপাশি ভিটামিন ‘সি’ও পাওয়া যায়।
লেবু দিয়ে শরবত, সালাদ বা লেবু চা তৈরি করা যায়। তবে লেবুর শরবতে অতিরিক্ত চিনি ব্যবহার না করাই ভালো।
সর্দি-কাশি হলে অনেকে গরম পানি ও লেবু পান করেন। এটি গলা আরাম দিতে পারে, তবে লেবু বা কোনো নির্দিষ্ট পানীয় সর্দি-কাশির চিকিৎসা নয়—উপসর্গ বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
আমড়া ও কামরাঙ্গা
আমড়া ও কামরাঙ্গা দেশীয় জনপ্রিয় ফল। এসব ফলেও ভিটামিন, খনিজ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট পাওয়া যায়। মৌসুমে পরিমিত পরিমাণে এসব ফল খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।
তবে কিডনির সমস্যা বা বিশেষ কোনো শারীরিক অসুস্থতা থাকলে কিছু ফল খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। এ ধরনের ক্ষেত্রে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যতালিকা তৈরি করা ভালো।
আনার: অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ ফল
আনার বা ডালিম দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, পুষ্টিগুণেও এটি সমৃদ্ধ। এতে বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যৌগ রয়েছে। নিয়মিত ও পরিমিত ফল খাওয়ার অংশ হিসেবে আনারও রাখা যেতে পারে।
আনারের দানা সরাসরি খাওয়া যায় কিংবা বিভিন্ন ফলের সালাদে ব্যবহার করা যায়।
আঙুরে রয়েছে নানা পুষ্টি উপাদান
সবুজ ও কালো—দুই ধরনের আঙুরেই বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট পাওয়া যায়। ফল হিসেবে আঙুর খেলে শরীরে পানি ও কিছু প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান যোগ হয়।
তবে আঙুরসহ যেকোনো ফল পরিমিত পরিমাণে খাওয়াই ভালো।
ড্রাগন ফল ও নাশপাতিও হতে পারে খাদ্যতালিকার অংশ
ড্রাগন ফলে ফাইবারসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে। অন্যদিকে নাশপাতিতে পানি ও ফাইবার পাওয়া যায়। ফলে প্রতিদিনের ফলের তালিকায় বৈচিত্র্য আনতে এসব ফলও রাখা যেতে পারে।
একই ধরনের ফল প্রতিদিন না খেয়ে বিভিন্ন রঙ ও ধরনের ফল পর্যায়ক্রমে খাওয়ার অভ্যাস করা ভালো।
শুধু ফল নয়, শাকসবজিও জরুরি
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো রাখতে শুধু ফল খেলেই হবে না। প্রতিদিনের খাবারে বিভিন্ন রঙের শাকসবজি, ডাল, মাছ, ডিম, দুধ বা অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারও রাখতে হবে।
গাজর, টমেটো, পালংশাক, লালশাক, ক্যাপসিকাম, ব্রকলি ও অন্যান্য মৌসুমি সবজি খাদ্যতালিকায় যুক্ত করা যেতে পারে।
বিভিন্ন ধরনের খাবার থেকে শরীর প্রয়োজনীয় ভিটামিন, খনিজ, প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান পায়। তাই একটি নির্দিষ্ট খাবারের ওপর নির্ভর না করে সুষম ও বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুদের খাবারে কীভাবে ফল যুক্ত করবেন?
অনেক শিশু সরাসরি ফল খেতে চায় না। তাদের ক্ষেত্রে ফলকে আকর্ষণীয়ভাবে পরিবেশন করা যেতে পারে। যেমন—
ফলের সালাদ তৈরি করা
বিভিন্ন ফল ছোট ছোট টুকরো করে দেওয়া
দইয়ের সঙ্গে ফল মিশিয়ে দেওয়া
ঘরে তৈরি ফলের স্মুদি দেওয়া
বিভিন্ন ফল দিয়ে স্বাস্থ্যকর নাশতা তৈরি করা
তবে অতিরিক্ত চিনি দিয়ে জুস বা মিষ্টি জাতীয় খাবার বানানোর পরিবর্তে তাজা ও সম্পূর্ণ ফল খাওয়ানোই ভালো।
সর্দি-কাশির সময়ে আরও যেসব বিষয় মনে রাখবেন
মৌসুমি ফল ও পুষ্টিকর খাবারের পাশাপাশি কয়েকটি সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাও জরুরি।
পর্যাপ্ত পানি পান, নিয়মিত হাত ধোয়া, পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ, ধূমপান ও ধোঁয়া এড়িয়ে চলা এবং অসুস্থ ব্যক্তির সংস্পর্শে সতর্ক থাকা—এসব অভ্যাস শরীর সুস্থ রাখতে সহায়ক।
সর্দি-কাশি বা জ্বরের উপসর্গ দীর্ঘস্থায়ী হলে, শ্বাসকষ্ট হলে, খুব বেশি জ্বর হলে কিংবা শিশুর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
শেষ কথা
ঋতু পরিবর্তনের সময়ে সুস্থ থাকতে দামি খাবারের প্রয়োজন নেই। আমাদের দেশেই পাওয়া যায় এমন পেয়ারা, আমড়া, কামরাঙ্গা, বরই, লেবু, কমলা, মালটা, আনার, নাশপাতি, ড্রাগন ফল ও আঙুরসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফল নিয়মিত ও পরিমিত খাওয়ার অভ্যাস করা যেতে পারে।
সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত ঘুম, পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন—এই চারটি অভ্যাসই শরীরকে সুস্থ রাখার অন্যতম ভিত্তি।