
নিজস্ব প্রতিবেদক
পরিকল্পিত ও টেকসই নগরায়নের লক্ষ্যে দেশের প্রতিটি সিটি করপোরেশন ও জেলায় মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নিরাপদ, আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জলবায়ু-সহনশীল নগর গড়ে তোলার পাশাপাশি নাগরিকদের জন্য পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করাই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
‘বিশ্ব বসতি দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব কথা বলেন। দিবসটি উপলক্ষে ৪ অক্টোবর দেওয়া ওই বাণীতে তিনি পরিকল্পিত নগরায়ন ও সবার জন্য পর্যাপ্ত আবাসনের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি পরিকল্পিত নগর শুধু ভবন ও সড়কের সমষ্টি নয়; বরং সেখানে নাগরিকদের জন্য প্রয়োজনীয় সেবা, নিরাপদ পরিবেশ, যোগাযোগব্যবস্থা, আবাসন এবং স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হয়। এ লক্ষ্যেই দেশের সিটি করপোরেশন ও জেলাগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ভিত্তিতে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
নিরাপদ ও বাসযোগ্য নগর গড়ার লক্ষ্য
প্রধানমন্ত্রীর বাণীতে বলা হয়, পরিকল্পিত নগরায়ন ও টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও বসবাসযোগ্য নগর গড়ে তোলা বিশ্ব বসতি দিবস উদযাপনের অন্যতম উদ্দেশ্য। বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং আবাসনের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। এর ফলে শহর ও নগরাঞ্চলে আবাসন, যোগাযোগ, নাগরিক সেবা, পরিবেশ এবং অবকাঠামোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যৎ নগর ব্যবস্থাপনার জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আবাসন, নগর পরিকল্পনা, নাগরিক সেবা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং জলবায়ু সহনশীলতাকে সমন্বয় করে দীর্ঘমেয়াদি নীতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
নিম্ন আয়ের মানুষের আবাসনে বিশেষ গুরুত্ব
সবার জন্য নিরাপদ, সাশ্রয়ী, পরিবেশসম্মত ও মর্যাদাপূর্ণ আবাসন নিশ্চিত করাকে সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করা এবং শহর ও নগরের উন্নয়ন যেন শুধু নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেদিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পিত ও সুষম নগর উন্নয়নের মাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য বসবাসের উপযোগী পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়।
অপরিকল্পিত নগরায়নে বাড়ছে নানা সংকট
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহর ও নগর দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। তবে অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে যানজট, বায়ু ও পরিবেশদূষণ, অপর্যাপ্ত নাগরিক সেবা, আবাসন সংকট এবং জলাবদ্ধতার মতো বিভিন্ন সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
এর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং জলবায়ুজনিত অভিবাসনও দেশের নগরগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। গ্রাম ও উপকূলীয় এলাকা থেকে জীবিকার প্রয়োজনে মানুষের শহরমুখী প্রবণতা বাড়ায় আবাসন ও নাগরিক সেবার চাহিদাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতের নগর পরিকল্পনায় পরিবেশ, জনসংখ্যার চাপ, যোগাযোগব্যবস্থা, আবাসন এবং নাগরিক সুবিধাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সবার জন্য পর্যাপ্ত আবাসনের আহ্বান
এবারের বিশ্ব বসতি দিবসের প্রতিপাদ্য ‘সবার জন্য পর্যাপ্ত আবাসন’। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এ প্রতিপাদ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, প্রত্যেক নাগরিকের জন্য এমন বাসস্থান নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যেখানে মানুষ নিরাপদে বসবাসের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় নাগরিক সেবা, সুস্থ পরিবেশ এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের সুযোগ পাবে।
সর্বজনীন আবাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি টেকসই নগরায়নের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য শহর ও বসতি গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই নগর
প্রধানমন্ত্রী বলেন, নগর উন্নয়নের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুন্দর, নিরাপদ ও বাসযোগ্য নগরজীবন নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
এ জন্য শুধু নতুন অবকাঠামো নির্মাণ নয়, বিদ্যমান শহরগুলোর পরিকল্পিত উন্নয়ন, নাগরিক সেবার মানোন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা এবং সাশ্রয়ী আবাসন ব্যবস্থার ওপর সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
সরকারের মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের বিভিন্ন জেলা ও সিটি করপোরেশনের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা আরও সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশ্ব বসতি দিবস
১৯৮৬ সাল থেকে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবার বিশ্ব বসতি দিবস পালিত হয়ে আসছে। নিরাপদ আবাসন, পরিকল্পিত নগরায়ন এবং টেকসই বসতি ব্যবস্থার গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরিই দিবসটির অন্যতম উদ্দেশ্য।
এবারের আয়োজনের মধ্য দিয়ে সবার জন্য পর্যাপ্ত আবাসন নিশ্চিত করা, পরিকল্পিত নগরায়নকে এগিয়ে নেওয়া এবং নিরাপদ ও টেকসই বসতি গড়ে তোলার প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর মতে, সর্বজনীন আবাসন ও পরিকল্পিত নগরায়ন নিশ্চিত করতে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, নগর কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এর মাধ্যমে দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত, পরিবেশবান্ধব ও মর্যাদাপূর্ণ নগরজীবন নিশ্চিত করার পথ আরও সুগম হবে।