
নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশে আঞ্চলিক অফিস স্থাপনের প্রস্তাব ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেটা। যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালিতে বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সফরকালে মেটার কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির সরাসরি উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
রোববার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে যুক্তরাষ্ট্র সফরের বিভিন্ন দিক তুলে ধরতে গিয়ে তিনি এ তথ্য জানান।
শামা ওবায়েদ বলেন, বাংলাদেশে মেটার একটি সরাসরি কার্যালয় বা আঞ্চলিক অফিস থাকলে দেশের বিপুলসংখ্যক ব্যবহারকারীকে আরও কার্যকর ও দ্রুত সেবা দেওয়া সম্ভব হবে। পাশাপাশি ব্যবহারকারীদের বিভিন্ন অভিযোগ, সমস্যা এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মসংক্রান্ত জটিলতার ক্ষেত্রে মেটার জবাবদিহি ও যোগাযোগের সুযোগও বাড়বে।
বিপুলসংখ্যক ফেসবুক ব্যবহারকারী, বাড়তে পারে সেবার মান
বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশেষ করে ফেসবুকের ব্যবহারকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। ফলে দেশের বাজারে মেটার সরাসরি উপস্থিতি থাকলে ব্যবহারকারীদের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির যোগাযোগ আরও সহজ হতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
শামা ওবায়েদ বলেন, বাংলাদেশে মেটার সরাসরি উপস্থিতি শুধু গ্রাহকসেবার ক্ষেত্রেই নয়, ডিজিটাল নিরাপত্তা, অনলাইন প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহি এবং বিভিন্ন অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দেশে আঞ্চলিক অফিস স্থাপনের প্রস্তাব মেটা ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে বলেও জানান তিনি।
সিলিকন ভ্যালিতে একাধিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক
বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের যুক্তরাষ্ট্র সফরে মেটার পাশাপাশি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সফরকালে অ্যাপল, এনভিডিয়া, গুগলসহ ১৫টির বেশি মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
এসব বৈঠকে বাংলাদেশের প্রযুক্তিখাতের সম্ভাবনা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সাইবার নিরাপত্তা, স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং বাংলা ভাষাভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘বাংলা এআই’ চালুর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনায় আসে।
প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে আরও দক্ষ করে তোলা এবং দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার বিষয়েও বৈঠকগুলোতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদন ও ম্যানুফ্যাকচারিং হাব গড়ার আলোচনা
যুক্তরাষ্ট্র সফরে বাংলাদেশে প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদন ও ম্যানুফ্যাকচারিং হাব গড়ে তোলার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করে দেশের প্রযুক্তি ও শিল্প খাতকে আরও সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়ে মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় করা হয়।
সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে প্রযুক্তি খাতে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা, দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানো এবং তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি করা।
শিক্ষা ও গবেষণায় সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ
প্রযুক্তিখাতের পাশাপাশি শিক্ষা ও গবেষণায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়েও সফরে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শামা ওবায়েদ জানান, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলে এবং অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির সঙ্গে শিক্ষা ও গবেষণায় সহযোগিতা বাড়াতে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে এ ধরনের সহযোগিতা বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
তরুণদের কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির লক্ষ্য
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলাই এই সফরের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় যুক্তরাষ্ট্র সফরের আয়োজন করা হয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাস্তবভিত্তিক কাজ এগিয়ে নেওয়া এবং বাংলাদেশের জন্য প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি করা।
প্রধানমন্ত্রীর সান ফ্রান্সিসকো সফর নিয়ে ‘গুঞ্জন’
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর সান ফ্রান্সিসকো সফর বাতিল হয়েছে—এমন আলোচনা প্রসঙ্গে শামা ওবায়েদ সেটিকে ‘গুঞ্জন’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর সান ফ্রান্সিসকো সফরের কোনো পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি ছিল না। বাস্তবভিত্তিক কাজ এগিয়ে নিতে এবং প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনা করতেই প্রতিনিধিদল পাঠানো হয়েছিল। এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে তথ্য যাচাই করে সংবাদ প্রকাশের আহ্বান জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
বাংলাদেশের প্রযুক্তিখাতে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত
মেটার আঞ্চলিক অফিস স্থাপনের প্রস্তাব ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা, শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বৈঠক, এআই ও সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা, প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদনের সম্ভাবনা এবং আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে শিক্ষা-গবেষণা সহযোগিতার অগ্রগতি—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সফরকে বাংলাদেশের প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখছে সরকার।
বিশেষ করে মেটার মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সরাসরি উপস্থিতি বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হলে ব্যবহারকারী সেবা, ডিজিটাল যোগাযোগ এবং বিভিন্ন অভিযোগ ব্যবস্থাপনায় নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।