
মুহাম্মদ সালাহ উদ্দীন, আলীকদম(বান্দরবান)
বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের সম্মানিত সাবেক সদস্য মোঃ সাইফুল ইসলাম রিমন—আলীকদমের উন্নয়ন-অভিযাত্রায় তাঁর দায়িত্বকালীন কর্মতৎপরতা আজ একদিকে প্রশংসার অনুরণন, অন্যদিকে নানামুখী সমালোচনার অভিঘাত সৃষ্টি করেছে। কিন্তু জনজীবনের কোনো কর্মযজ্ঞের মূল্যায়ন ক্ষণিকের কোলাহলে নয়; তার প্রকৃত বিচার নিহিত থাকে কালের কষ্টিপাথরে, নথির নিরেট সত্যে এবং জনজীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তনের অভিঘাতে।
অন্তর্বর্তীকালীন জেলা পরিষদে দায়িত্ব পালনকালে সাবেক সদস্য মোঃ সাইফুল ইসলাম রিমন আলীকদমের অনুন্নত ও জরাজীর্ণ জনপদকে উন্নয়নের পরশে সিঞ্চিত করার প্রত্যয়ে বিভিন্ন প্রকল্প ও উন্নয়ন-পরিকল্পনা নিয়ে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের দ্বারস্থ হয়েছেন—এমন আলোচনা স্থানীয় পরিসরে বিদ্যমান।
মসজিদ, মন্দির, গির্জা, কালভার্ট, সড়কসহ প্রত্যন্ত জনপদের অবকাঠামোগত প্রয়োজনকে উন্নয়ন-পরিকল্পনার পরিসরে আনতে তাঁর উদ্যোগ ছিল—এমন দাবি থাকলে তার যথার্থতা যাচাইয়ের সর্বোত্তম পথ হলো প্রকল্পের নথি, বাস্তবায়নের বিবরণ এবং উপকারভোগী মানুষের অভিজ্ঞতা।
কাজের অঙ্গনে সমালোচনা থাকবে—এটাই স্বাভাবিক; কিন্তু সমালোচনা ও কুৎসা একার্থক নয়, প্রশ্ন ও বিদ্বেষও সমার্থক নয়। কোনো প্রকল্পে অনিয়ম, দুর্নীতি, অপচয় কিংবা প্রশাসনিক অসংগতি থাকলে তার সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা হোক, যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহি দাবি করা হোক; কিন্তু প্রমাণহীন অভিযোগ, ব্যক্তিগত আক্রমণ কিংবা নিরন্তর হেয়প্রতিপন্ন করার প্রয়াসকে গণস্বার্থের পরিশীলিত সমালোচনা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার অবকাশ নেই।
রিমনের সমালোচকদের প্রতিও প্রশ্নটি সরল—আপত্তি যদি কর্মে হয়, তবে কর্মের হিসাব দিন; অভিযোগ যদি প্রকল্পে হয়, তবে প্রকল্পের নথি সামনে আনুন; প্রশ্ন যদি অর্থব্যয়ে হয়, তবে ব্যয়ের পরিসংখ্যান প্রকাশ করুন। ব্যক্তি-বিদ্বেষের ধূম্রজাল নির্মাণ করে সত্যকে আড়াল করা যেমন সমীচীন নয়, তেমনি প্রশংসার মোহে বাস্তবতার বিচ্যুতিও গ্রহণযোগ্য নয়। গণমানুষের স্বার্থে প্রয়োজন এমন এক নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে প্রশংসা হবে প্রমাণনির্ভর, সমালোচনা হবে তথ্যসমৃদ্ধ এবং জবাবদিহি হবে সর্বজনীন।
আলীকদমের উন্নয়ন-ইতিহাসও তাই পুনঃপাঠের দাবি রাখে। বিভিন্ন সময়ে জেলা পরিষদে আলীকদমের একাধিক প্রতিনিধি দায়িত্ব পালন করেছেন; তাঁদের দায়িত্বকালে কী কী প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল, কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছিল এবং সাধারণ মানুষ তার কতখানি সুফল পেয়েছিল—এসব প্রশ্নও সমান নিষ্ঠায় অনুসন্ধান করা আবশ্যক। একজন সাবেক সদস্যের কর্মকালকে যদি কাঁটাছেঁড়া করে বিচার করা হয়, তবে পূর্ববর্তী সকল প্রতিনিধিত্বের কর্মপরম্পরাকেও একই দাঁড়িপাল্লায় ওজন করাই ন্যায়সংগত।
একজন তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি জনপদের উন্নয়নে এগিয়ে এলে তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ যে নির্ভুল হবে—এমন দাবি কেউ করতে পারে না। ভুল থাকলে সংশোধন চাইতে হবে, ত্রুটি থাকলে তা চিহ্নিত করতে হবে, অনিয়ম থাকলে তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু যে সমালোচনা সংশোধনের পরিবর্তে অপমানের অভিপ্রায় বহন করে, যে ভাষা যুক্তির পরিবর্তে বিদ্বেষের উন্মত্ততা ধারণ করে—তা সমাজকে আলোকিত করে না; বরং সত্যের পরিসরকে আরও অন্ধকারাচ্ছন্ন করে।
বাংলা সাহিত্যের মহত্তম ঐতিহ্য আমাদের যে বোধের শিক্ষা দেয়, তার সারকথা মানুষ ক্ষণস্থায়ী, কর্ম তার উত্তরাধিকার। কোলাহল স্তব্ধ হয়, অপবাদ বিস্মৃত হয়, কিন্তু জনপদের বুকে নির্মিত একটি সেতু, সংস্কারকৃত একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, উন্নত একটি জনপদ কিংবা মানুষের জীবনে সৃষ্ট সামান্য স্বস্তিও সময়ের দীর্ঘ প্রবাহে সাক্ষ্য হয়ে থাকে। অতএব রিমনের কর্মযজ্ঞের বিচার হোক আবেগের উচ্ছ্বাসে নয়, যুক্তির দীপ্তিতে; ব্যক্তিগত বিরাগে নয়, প্রমাণের দৃঢ়তায়; পক্ষপাতের আবরণে নয়, জনগণের বাস্তব অভিজ্ঞতার নিরিখে।
সাবেক সদস্য মোঃ সাইফুল ইসলাম রিমনের প্রতি প্রশংসা থাকলে তারও প্রমাণ থাকুক, সমালোচনা থাকলে তারও ভিত্তি থাকুক কারণ জবাবদিহি একমুখী কোনো তরবারি নয়; এটি সবার জন্য সমান ন্যায়দণ্ড। আলীকদমের উন্নয়নের প্রশ্নে তাই ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে কোলাহল নয়, কর্মকে কেন্দ্র করে সংলাপ; অপপ্রচার নয়, তথ্য; বিদ্বেষ নয়, যুক্তি; আর প্রতিহিংসা নয়—জবাবদিহিতাই হোক শেষ কথা।